বিশ্বকাপে এশিয়ার নতুন জাগরণ
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের স্থায়ী চিত্র—এশিয়ার দলগুলো বড় স্বপ্ন নিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্বেই থেমে যেত। ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী দলের বিপক্ষে লড়াই করলেও ফল আসত খুব কম। কখনো কখনো বড় কোনো দলকে হারানো বা ড্র করাই ছিল এশিয়ার ফুটবলের ‘উৎসবের মুহূর্ত’। কিন্তু সেই দিনগুলো যেন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়ার ফুটবল এক নতুন রূপে হাজির হয়েছে।
এই আসরে এশিয়া থেকে অংশ নিয়েছে ৯টি দল, এবং প্রথম রাউন্ডের পর দেখা যাচ্ছে অন্তত ৬টি দল এখনো নকআউট পর্বে যাওয়ার লড়াইয়ে টিকে আছে। এটা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এশিয়ান ফুটবলের মানোন্নয়নের একটি বড় বার্তা।
দক্ষিণ কোরিয়া তাদের লড়াকু মানসিকতা আবারও দেখিয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলের জয় তুলে নেয় তারা। জাপান আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও ২-২ গোলে ড্র করে ম্যাচে ফিরে আসে—যা তাদের পরিণত ফুটবলের প্রমাণ।
অস্ট্রেলিয়া তুরস্ককে ২-০ গোলে হারিয়ে দেখিয়েছে যে তারা আর শুধু অংশগ্রহণকারী দল নয়, বরং ফল নির্ধারণকারী শক্তি। সৌদি আরব আবারও বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করেছে—২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর এবার তারা উরুগুয়ের মতো অভিজ্ঞ দলের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে চমক দেখায়।
কাতার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। ইরানও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে দেখিয়েছে লড়াইয়ের মানসিকতা। এসব ফলাফল শুধু পয়েন্ট নয়, বরং আত্মবিশ্বাসেরও বড় ভিত্তি তৈরি করছে।
অন্যদিকে ইরাক নরওয়ের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে, উজবেকিস্তান কলম্বিয়ার বিপক্ষে এবং জর্ডান অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পরাজিত হয়েছে। তবে এসব হারও এশিয়ার সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারছে না।
ফুটবল ইতিহাস বলছে, এশিয়ার বড় সাফল্য এসেছে ধাপে ধাপে। ১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়া ইতালিকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল, যা ছিল প্রথম বড় বিস্ময়। ১৯৯৪ সালে সৌদি আরব বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। আর ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনাল অভিযান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন হিসেবে আজও স্মরণীয়।
তবে এবারের পার্থক্য স্পষ্ট—আগের মতো একক কোনো দলের ওপর নির্ভরতা নেই। এবার একসাথে একাধিক এশিয়ান দল ভালো খেলছে, পয়েন্ট তুলছে, বড় দলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এটা দেখাচ্ছে এশিয়ার ফুটবল এখন শুধু সম্ভাবনা নয়, বাস্তব শক্তি হিসেবেও উঠে আসছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো সেই টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে, যেখানে এশিয়া আর শুধু ‘আন্ডারডগ’ থাকবে না—বরং বিশ্ব ফুটবলের নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করবে।
মতামত দিন