রাবিতে ‘৭১-২৪’ এর দাঁড়িপাল্লার চিত্রকর্ম নিয়ে সমালোচনা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই বিপ্লব স্মরণে আয়োজিত এক চিত্রপ্রদর্শনীতে প্রদর্শিত একটি চিত্রকর্ম নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। শিল্পকর্মটিতে দৃশ্যমান উপায়ে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মনে হয় ১৯৭১ সালের চেয়ে ২০২৪ সালের গুরুত্ব বেশি।
উক্ত চিত্রকর্মে একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতকে দাঁড়িপাল্লা ধরে রাখতে দেখা যায়। পাল্লার একপাশে লাল রঙে লেখা ‘৭১’ এবং অন্যপাশে গাঢ় রঙে লেখা ‘২৪’। এতে ‘২৪’ লেখা অংশটি সামান্য নিচের দিকে ঝুঁকে রয়েছে, যা দেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গত রবিবার সকালে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: রঙ ও তুলিতে মুক্ত স্বদেশ’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী এই চিত্রপ্রদর্শনীটি শুরু হয়।
এই বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা জনগণের ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে। ১৯৭১ ও ২০২৪-কে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া কেবল বিভাজনই বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত পরাজিত শক্তিকেই সুবিধা দেবে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহি বলেন, ১৯৭১ সাল হচ্ছে আমাদের দেশের ভিত্তিপ্রস্তর আর ২০২৪ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের গুরুত্ব বোঝাতে ১৯৭১-কে ছোট করার কোনো প্রয়োজন নেই। এক ইতিহাসকে অপমান করে আরেক ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
একই অভিমত ব্যক্ত করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান বলেন, এই দুটি ঘটনা দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, তাই এদেরকে মুখোমুখি দাঁড় করানো উচিত নয়। আমরা ১৯৭১ ও ২০২৪-কে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখতে চাই না। বরং এই দুটি ঘটনা থেকেই শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।
তবে নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে চিত্রশিল্পী কাজের ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দেন। তিনি জানান, ১৯৭১ ও ২০২৪-এর মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা দেখানো তার মূল উদ্দেশ্য ছিল না, বরং এই দুই ঘটনার অসম তুলনাকে তুলে ধরাই ছিল তার উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের পর থেকে একটি গোষ্ঠী ২০২৪-কে ১৯৭১ সালের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। আমার শিল্পকর্মকে সেভাবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত একটি রূপকধর্মী কাজ, যার মাধ্যমে আমি এই অসম তুলনাটিকেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন মোহাম্মদ আলী জানান, তিনি ক্যাম্পাসে না থাকায় শিল্পকর্মটি দেখতে পাননি, তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না।
চিত্রকর্ম নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিবন্ধনের মাধ্যমে কাজগুলো বাছাই করা হয় এবং এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সিরামিক ও ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম।
ডিনের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম প্রদর্শনীসংক্রান্ত একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করার কথা স্বীকার করে বলেন, সত্যি বলতে আমি কেবল একটি চিঠিতেই স্বাক্ষর করেছিলাম। শিল্পকর্মগুলো সঠিকভাবে পর্যালোচনা বা নিরীক্ষা না করেই জমা নেওয়া হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, এই প্রদর্শনী মূলত চারুকলা অনুষদের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত হয়েছে। জনসংযোগ দপ্তর কেবল সিনেট ভবনে প্রদর্শনীর স্থান বরাদ্দ দেওয়ার দায়িত্বে ছিল, শিল্পকর্ম নির্বাচনের সঙ্গে দপ্তরের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে চারুকলা অনুষদ আয়োজিত আর্ট ক্যাম্পের বিভিন্ন মাধ্যমে তৈরি ৮০টি চিত্রকর্ম নিয়ে এই প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে।
মতামত দিন