হাসনাতের বক্তব্য ‘অত্যন্ত হাস্যকর ও অপরিপক্ক গল্পের সম্ভার’: নেত্র নিউজকে সেনাবাহিনী
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ’র অভিযোগ অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। হাসনাত দাবি করেছিলেন, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে ‘পরিশোধিত’ আওয়ামী লীগকে মেনে নিতে ‘চাপ’ দিয়েছিলেন।
হাসনাতের ওই বক্তব্যকে ‘অত্যন্ত হাস্যকর এবং অপরিপক্ক গল্পের সম্ভার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে সেনাবাহিনী। ২৭ বছর বয়সী এই ছাত্রনেতার পোস্টকে ‘সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি বৈ অন্য কিছু নয়’ বলেও মন্তব্য করা হয়েছে সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে নেত্র নিউজকে দেয়া বিবৃতিতে।
শনিবার (২২ মার্চ) দেয়া ওই বিবৃতিতে হাসনাত আব্দুল্লাহকে ‘আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয় নিয়ে তাদেরকে প্রস্তাব বা চাপ প্রয়োগের’ অভিযোগও অস্বীকার করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত ১১ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসে হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তবে হাসনাত আব্দুল্লাহ ও এনসিপির আরেক প্রধান সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের আগ্রহেই ওই বৈঠকটি হয়েছিল।
হাসনাত আব্দুল্লাহর ফেসবুক পোস্টের দুদিন পর রোববার (২৩ মার্চ) নেত্র নিউজের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। ওই পোস্টে ‘ক্যান্টনমেন্টের সম্পৃক্ততায় আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টার’ অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি, যা পরে ভাইরাল হয়ে যায়।
একটি সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্ত ভিডিওও পোস্ট করেন হাসনাত। যেখানে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দাবি করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের নিয়োগ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন সেনাপ্রধান।
পরে আসিফ তার ফেসবুক পেজে ১৭ মিনিটের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেন।
সেনাবাহিনীর বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে নেত্র নিউজ জানিয়েছে, ওই বৈঠকটি ‘তাদেরকে ডেকে এনে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রস্তাব দেয়া বা চাপ সৃষ্টির বিষয় ছিল না’।
বরং সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং দলের আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম দীর্ঘদিন ধরে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ করতে চেয়েছিলেন এবং তাদের অনুরোধেই বৈঠকটি হয়।
সেনাবাহিনী আরও স্পষ্ট করে জানায়, সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করতে সারজিস আলম তার সামরিক উপদেষ্টাকে ফোন করেন। পরে তাদের সেনা সদর দপ্তরে আসতে বলা হয়। এরপর তারা সেনা ভবনে এসে অপেক্ষা করেন এবং জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার সরকারি দায়িত্ব পালন শেষে তাদের সঙ্গে দেখা করেন।
নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে নতুন রূপে পুনর্বাসনের বিষয়ে সেনানিবাসের কাছ থেকে ‘ভারতের পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করা হয়েছে- শুক্রবার (২২ মার্চ) হাসনাত আব্দুল্লাহর এমন ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষিতে নেত্র নিউজ যোগাযোগ করলে একজন মুখপাত্রের মাধ্যমে বক্তব্য দেয় সেনাসদর।
বাংলাদেশে গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এর সূচনা ঘটেছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভে। পরে গঠিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম। ৮ আগস্ট গঠিত নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে ওই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট তিনজন ছাত্রনেতা দায়িত্ব পান। তাদেরই একজন নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এসসিপি) আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন। দলটিতে দুই আঞ্চলিক প্রধান সংগঠকের পদ পান হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম।
ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও দাবি করেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে’।
সুনির্দিষ্টভাবে তিনি বলেন, ‘সেনানিবাস থেকে ১১ মার্চ দুপুর দুইটা ৩০ মিনিটের বৈঠকে তাদের এই নয়া আওয়ামী লীগকে মেনে নিতে সমঝোতা ও সংসদের আসন ভাগাভাগির প্রস্তাব দেয়া হয়’।
তার পোস্টের পর ওই রাতেই সংবাদ সম্মেলন ডাকে এনসিপি। সেখানে নেত্র নিউজের একজন প্রতিবেদক হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, সেনানিবাসে তিনি যে বৈঠকটির কথা বলছেন, তা কি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে হয়েছিল কি না। কিন্তু এই বিষয়ে তিনি সরাসরি জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান। হাসনাত বলেন, ‘আমিতো সেখানে ‘ক্যান্টনমেন্ট’ উল্লেখ করেছি, আপনারা কথা বলতে পারেন সেখানে’।
আরেকজন সাংবাদিক তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন কার উদ্যোগে বৈঠকটি হয়েছিল। জবাবে হাসনাত বলেন, সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ও বিদ্যমান আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন ছিল। এসব বিষয়ে ‘কথা বলতে আমাদেরকে আহ্বান জানানো হয়েছিল’।
সংবাদ সম্মেলনের পর নেত্র নিউজের একজন প্রতিবেদক আবারও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি ‘বাইনারি’ বা হ্যাঁ-না জবাব দিতে রাজি হননি।
সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, সেটি নেত্র নিউজ স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিটের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও পৃথকভাবে নেত্র নিউজকে বলেছেন, ছাত্রনেতাদের আগ্রহ ও উদ্যোগেই ওই বৈঠকটি হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে আলোচনা হওয়ার বিষয়টি সেনা সদরের বিবৃতিতে অস্বীকার করা হয়নি। সেখানে বলা হয়, ‘আলোচনায় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গ উঠে আসলে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান নিজের অভিমতের কথা ছাত্রনেতাদের জানান। বিবৃতিতে সেনাপ্রধানের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘আওয়ামী লীগের যেসব নেতারা ফৌজদারি মামলায় জড়িত নয় ও ক্লিন ইমেজের অধিকারী তাদের সমন্বয়ে নতুন আওয়ামী লীগ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, ফলপ্রসু ও আন্তর্জাতিক মহলে অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা পাবে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকার ও সব রাজনৈতিক দল মিলে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি’।
আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গে দেয়া বক্তব্য সেনাপ্রধানের নিজস্ব অভিমত হিসেবে আখ্যা দিয়ে ছাত্রনেতাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও বিবৃতিতে অস্বীকার করা হয়েছে। ‘প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি কোনোক্রমেই তাদেরকে ডেকে নিয়ে যাওয়া এবং আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয় নিয়ে তাদেরকে প্রস্তাব বা চাপ প্রয়োগের ঘটনা নয়’- যোগ করা হয় সেনাসদরের বিবৃতিতে।
এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর (মতো) প্রতিষ্ঠিত সুশৃঙ্খল বাহিনীর প্রধান সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের যুগ্ম সংগঠকদের ডেকে নিয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন বা চাপ প্রয়োগ করছেন, যা অত্যন্ত হাস্যকর ও অপরিপক্ক গল্পের সম্ভার বলে প্রতীয়মান (হয়)’।
সেনাসদরের বক্তব্যে বলা হয়, ‘এই দুই ছাত্র সমন্বয়ককে সেনাবাহিনী প্রধান ‘অত্যন্ত স্নেহের দৃষ্টিতে ছেলের’ মতো দেখতেন। তিনি (স্নেহবৎসল) পরিবেশে তাদের সঙ্গে নানা আলাপচারিতা করেন। প্রাসঙ্গিকভাবে তাদের নতুন দল গঠনের শুভকামনা ও পরবর্তী রাজনৈতিক পথ চলার বিষয়ে নানা প্রসঙ্গে আলাপ করেন’।
এছাড়াও পরবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে সেনাপ্রধান তাদের রাজনৈতিক দলের প্রস্তুতি, অংশগ্রহণ ও অন্যান্য সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সকল দলের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে ব্যাখ্যা করে’- যোগ করা হয় বিবৃতিতে।
এতে আরও বলা হয়, ‘সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে দেখা করার ১০ দিন পর ফেসবুকে হাসনাত আব্দুল্লাহর এই ধরনের অনভিপ্রেতকর পোস্ট দেওয়া সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি বৈ অন্য কিছু নয়’।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে