এনভিডিয়াকে পেছনে ফেলে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে অ্যাপল
বিশ্বের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন চলাকালে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য সাময়িকভাবে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার পর ইতিহাসে দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে এই বিরল কীর্তি গড়ল আইফোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটি।
ওই দিন লেনদেনের একপর্যায়ে অ্যাপলের শেয়ারদর বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪২ দশমিক ৮৯ ডলারে, যার সুবাদে প্রতিষ্ঠানটির মোট বাজারমূল্য ছুঁয়ে যায় ৫ দশমিক শূন্য তিন ছয় ট্রিলিয়ন ডলার। তবে বাজার বন্ধের আগে দর কিছুটা কমে আসে এবং দিনশেষে শেয়ারপ্রতি মূল্য স্থির হয় প্রায় ৩৩৯ থেকে ৩৪০ ডলারের মধ্যে, ফলে চূড়ান্ত বাজারমূল্য নেমে আসে প্রায় ৪ দশমিক ৯৮ থেকে ৪ দশমিক ৯৯ ট্রিলিয়ন ডলারে।
এর ঠিক একদিন আগেই বাজারমূল্যের নিরিখে এনভিডিয়াকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আসনটি পুনর্দখল করে অ্যাপল। প্রসঙ্গত, গত বছরের অক্টোবরে সবার আগে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছিল এনভিডিয়া, যা জিপিইউ নির্মাণে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের চাহিদার সুবাদে সম্ভব হয়েছিল। তবে চলতি বছরে এনভিডিয়ার শেয়ারের প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলক ম্লান, মাত্র কয়েক শতাংশ। বিপরীতে চলতি বছরে অ্যাপলের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ, যা প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশ চোখে পড়ার মতো।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতায় না নেমে ভিন্ন পথ বেছে নেওয়াই অ্যাপলকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে। মেটা, অ্যালফাবেট কিংবা মাইক্রোসফটের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীরা যখন নিজস্ব ডাটা সেন্টার আর চিপ তৈরিতে শত শত কোটি ডলার ঢালছে, তখন অ্যাপল তার ভার্চুয়াল সহকারী সিরি-কে আধুনিক করতে গুগলের এআই প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছে, ফলে বিপুল ঋণ ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি এড়াতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে বৈশ্বিক মেমোরি চিপ সংকটের জেরে সম্প্রতি ম্যাকবুক ও আইপ্যাডের দাম কিছুটা বাড়ালেও আইফোনের মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছে অ্যাপল। ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে; এমন শঙ্কায় ক্রেতারা ব্যাপক হারে আইফোন কিনছেন, যা প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে পেমেন্ট প্রতিষ্ঠান ক্লারনার সঙ্গে যৌথভাবে ‘আপগ্রেড’ নামে নতুন একটি লিজ কর্মসূচি চালু করে অ্যাপল, যার আওতায় গ্রাহকেরা মাসিক ১৭ দশমিক ৯৯ ডলারে আইফোন, ১১ দশমিক ৯৯ ডলারে অ্যাপল ওয়াচ বা আইপ্যাড এবং ২৪ দশমিক ৯৯ ডলারে ম্যাক ব্যবহারের সুযোগ পাবেন দুই বছর মেয়াদে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেস্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান বিশ্লেষক দীপঞ্জন চ্যাটার্জি মন্তব্য করেন, অবকাঠামোতে বিনিয়োগের বদলে গ্রাহক অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে এআই ব্যয়ের প্রতিযোগিতা এড়িয়ে গেছে অ্যাপল। নতুন লিজ সুবিধাটি এক ধরনের চতুর কৌশল; সরাসরি দাম না কমিয়েও এককালীন বড় খরচের চাপ একটি সহজ মাসিক কিস্তিতে রূপান্তরিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যা গ্রাহকদের মানসিকভাবে কেনাকাটায় উৎসাহিত করবে।
উল্লেখ্য, একই সময়ে বড় ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও যাচ্ছে অ্যাপল। আগামী ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে নির্বাহী চেয়ারম্যানের ভূমিকায় যাবেন টিম কুক, আর নতুন প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন জন টের্নাস। আজ বৃহস্পতিবার বাজার বন্ধের পর চলতি অর্থবছরের সর্বশেষ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব ২০ শতাংশের কাছাকাছি বাড়তে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
বর্তমানে বাজারমূল্যের নিরিখে অ্যাপলের ঠিক পরেই রয়েছে এনভিডিয়া, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে অ্যালফাবেট (প্রায় ৩ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার) ও মাইক্রোসফট (প্রায় ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার)। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শক্তিশালী নগদ প্রবাহ, সেবা খাতের স্থিতিশীল আয় এবং ব্রডকমের সঙ্গে সিলিকন সরবরাহ চুক্তির মতো পদক্ষেপ অ্যাপলের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে আরও মজবুত ভিত্তি দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মতামত দিন