Views Bangladesh Logo

গানের ভাব ও দর্শনের সঙ্গে একাত্ম হলেই একজন শিল্পী শ্রোতার মন জয় করতে পারেন: ঊর্বী সোম

Urvi  Som

ঊর্বী সোম

নজরুল সংগীত ও উচ্চাঙ্গসংগীতের একজন স্বনামধন্য শিল্পী, শিক্ষক ঊর্বী সোম। সরকারি সংগীত কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি একই প্রতিষ্ঠান থেকে বি. মিউজিক এবং নজরুল সংগীতে প্রথম শ্রেণিতে এম. মিউজিক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে সরকারি সংগীত কলেজেই শিক্ষকতা করছেন তিনি।

বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং কেন্দ্রীয় নজরুল সংগীত শিল্পী পরিষদের তালিকাভুক্ত এই শিল্পী নজরুল সংগীতে জাতীয় পর্যায়ে অসংখ্য প্রথম পুরস্কার ও স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন। পদ্মকুঁড়ি (২০০৩), জিসাস জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, আন্তঃকলেজ জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা (২০১৫) এবং জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ (২০১৬)-এ প্রথম স্থান অর্জন তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্যের অংশ।

সংগীতচর্চা, শিক্ষকতা, বিচারকের অভিজ্ঞতা, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য পরামর্শ এবং নজরুল সংগীতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে 'ভিউজ বাংলাদেশ'-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের অভিজ্ঞতা, দর্শন ও ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন ঊর্বী সোম। সাক্ষাতকার নিয়েছেন সুমাইয়া জেসমিন।

আপনি ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে সংগীতে যাত্রা শুরু। সেই শৈশবের কোন স্মৃতি আজও আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে?

যে স্মৃতি আজও আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে, তা হলো ২০০৩ ও ২০০৬ সালে জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ‘জাসাস’ এবং ‘পদ্মকুঁড়ি’-তে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার অর্জনের মুহূর্তগুলো। তখন আমি কাজী নজরুল ইসলামের ‘জনম জনম গেলো, আশা পথ চাহি’ গানটি পরিবেশন করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় শ্রদ্ধেয় ফেরদৌস আরা ম্যাডাম আমাকে ডেকে আশীর্বাদ করেছিলেন। তাঁকে এত কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর স্নেহ ও উৎসাহ পাওয়া আজও আমার কাছে অমূল্য স্মৃতি।

খুলনাতে থাকাকালীন সময়ে আমার পরম শ্রদ্ধেয় সংগীত গুরু যারা ছিলেন, তারা হলেন- শেখ আলী আহম্মদ, কালীপদ দাস,পূর্ণ চন্দ্র মন্ডল। তবে সংগীতজীবনের ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছেন আমার বাবা-মা। মায়ের হাত ধরেই সংগীতে হাতেখড়ি, আর বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও কঠোর অনুশাসন না থাকলে হয়তো আজ সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়াই সম্ভব হতো না। ছোটবেলায় তাঁদের কঠোরতা অনেক সময় ভালো লাগত না এবং বলা যায় এক পর্যায়ে সংগীত কলেজে আমাকে অনেকটা জোরপূর্বকই ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন বাবা আর মামা কিন্তু আজ বুঝি—সন্তানের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ শ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

খুলনা থেকে ঢাকায় এসে সরকারি সংগীত কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং দেশের প্রখ্যাত গুরুর কাছে তালিম নেওয়ার অভিজ্ঞতা আপনার শিল্পীজীবনকে কীভাবে বদলে দিয়েছে?


খুলনা থেকে ঢাকায় এসে সরকারি সংগীত কলেজে পড়াশোনা আমার শিল্পীজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ব্যাবহারিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শ্রদ্ধেয় শামীমা পারভীন, ফেরদৌস আরা, সৈয়দ সাজিদ হোসেন, ড. ফকির শহীদুল ইসলাম সুমন, মফিজুর রহমান, রাশেদুল হাসান জীবন,মাইনুল আহসান স্যার, এবং তত্বীয় সংগীতের ক্ষেত্রে তিলোত্তমা সেন, ড. একা সাহলা, ড. শিউলি ভট্টাচার্যীর মত গুনী শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসে নিজেকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁদের স্নেহ, শাসন, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও আশির্বাদ আমার শিল্পীসত্তাকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। সত্যি বলতে বাবা মায়ের পর তাঁদের আশির্বাদই আমার চলার পথটাকে এগিয়ে দিয়েছে।

সংগীত শেখার কোনো শেষ নেই - এই বিশ্বাস থেকেই এখনও নিজেকে নিয়মিত শাণিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। বর্তমানে ওপার বাংলার প্রখ্যাত শিল্পী ও সংগীতগুরু ড. রাগেশ্রী দাসের কাছে ঠুমরি, দাদরা এবং রাগাশ্রয়ী বাংলা গানের তালিম নিয়েছি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংগীতে আরও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। একজন শিল্পী হিসেবে আজীবন সংগীত শিক্ষার্থী হয়েই থাকতে চাই। সকল শিক্ষাগুরুদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা থাকবে সব সময়।

নজরুল সংগীতে জাতীয় পর্যায়ে অসংখ্য প্রথম পুরস্কার ও স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন। প্রতিযোগিতার মঞ্চে সফল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কী ছিল বলে মনে করেন?

প্রতিযোগিতায় সফল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, সঠিক গান নির্বাচন, সেই গানকে নিজের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ করা এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মঞ্চে পরিবেশন করা। একজন শিল্পী যখন গানের ভাব ও দর্শনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গাইতে পারেন, তখনই কেবল শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়। প্রকৃত শিল্পীর মধ্যে শেখার আগ্রহ ও নম্রতা থাকা জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, ‘’ছদ্মবিনয় সংগীতের সাথে সাংঘর্ষিক।’’

অনেক শিল্পী জনপ্রিয়তার জন্য মিডিয়াকেন্দ্রিক থাকেন, কিন্তু আপনি শিক্ষকতা ও মানসম্মত সংগীতচর্চাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনের দর্শন কী?

মিউজিক শেষ করার পর থেকেই শিক্ষকতা আমার পেশা। আমি মনে করি, যে কাজই করি, সেটি সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে করা উচিত। এই জন্য আমি প্রফেসর শামীমা পারভীন ম্যাডামের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। কারন উনি আমাকে শিক্ষকতা করার সেই সুযোগ করে দিয়েছেন।

শিক্ষকতা আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। শিক্ষকতা করতে গিয়ে এই পেশার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়েছে। তাই মিডিয়াকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তার চেয়ে মানসম্মত সংগীতচর্চা ও শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। কিংবা এভাবেও বলা যায়, মিডিয়াকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তার জন্য যে পরিমাণ সময় ও শ্রম প্রয়োজন, তা আমি দিতে পারিনি। তবে বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের ভালোবাসা, প্রশংসা ও উৎসাহ আমাকে নতুন করে নিয়মিত পরিবেশনা ও মিডিয়ায় সক্রিয় হতে অনুপ্রাণিত করছে।

বর্তমানের সংগীতচর্চায় আপনি সবচেয়ে বড় কোন চ্যালেঞ্জটি দেখছেন?

বর্তমান সময়ে শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশনার মানসম্মত মঞ্চ সীমিত। ফলে নতুন শিল্পীদের জন্য নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগও কমে যায়। আমার বিশ্বাস, যদি মানসম্মত অনুষ্ঠান ও পরিবেশনার প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা বাড়ে, তাহলে তরুণ শিল্পীরা তাঁদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবেন।

প্রায় নয় বছর ধরে সরকারি সংগীত কলেজে শিক্ষকতা করছেন। একজন ভালো সংগীতশিল্পী গড়ে তুলতে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী বলে আপনি মনে করেন?

বর্তমানে আমরা অনেক মেধাবী ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীকে দেখি, যারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগীত শেখার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু গান শেখানো নয়, একজন ভালো মানুষ ও আত্মবিশ্বাসী শিল্পী গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীরা যেন ভয় বা সংকোচ ছাড়াই শেখার পরিবেশ পায়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আপনি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও কেন্দ্রীয় নজরুল সংগীত শিল্পী পরিষদের তালিকাভুক্ত শিল্পী। আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে নজরুল সংগীতের চর্চাকে কীভাবে আরও জনপ্রিয় করা যায়?


কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি এতটাই অনন্য ও কালজয়ী যে, এর তুলনা বিশ্বসাহিত্য ও বিশ্বসংগীতে খুব কমই পাওয়া যায়। তাই আধুনিক ও জনপ্রিয় সব ধরনের প্ল্যাটফর্মে নজরুল সংগীতকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারলে তাঁর সৃষ্টি নিজস্ব মহিমায় নতুন প্রজন্মের কাছেও আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।

ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানসম্মত সংগীতচর্চা কীভাবে ধরে রাখা সম্ভব?

প্রযুক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কখনোই নিয়মিত রেওয়াজের বিকল্প হতে পারে না। একজন শিল্পীকে প্রতিদিন নিজের ওপর কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্বের বড় শিল্পীদের পরিবেশনা শুনতে হবে। কারণ সংগীত শেখার প্রথম পাঠই হলো—মন দিয়ে শোনা, তারপর গাওয়া।

মানসম্মত সংগীতচর্চার মূল ভিত্তি হলো নিয়মিত রেওয়াজ। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যতই এগিয়ে যাক না কেন, একজন শিল্পীকে শেষ পর্যন্ত নিজের দক্ষতার মাধ্যমেই শ্রোতার হৃদয়ে স্থান করে নিতে হয়। তাই প্রযুক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কখনোই নিয়মিত রেওয়াজের বিকল্প হতে পারে না। একজন শিল্পীকে প্রতিদিন নিজের ওপর কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্বের বড় শিল্পীদের পরিবেশনা শুনতে হবে। কারণ সংগীত শেখার প্রথম পাঠই হলো মন দিয়ে শোনা, তারপর গাওয়া।

আপনি 'নতুন কুঁড়ি ২০২৫', জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে কোন গুণগুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে, আর কোন বিষয়গুলোতে উন্নতির প্রয়োজন বলে মনে করেন?

বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের আত্মবিশ্বাস ও নিজেদের প্রকাশ করার সাহস আমাকে মুগ্ধ করে। তবে নিয়মিত চর্চার ক্ষেত্রে তাদেরকে আরও মনোযোগী হতে হবে। প্রতিভা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি সাধনাও একজন শিল্পীকে পরিপূর্ণ করে তোলে।

বর্তমান সময়ে নজরুল সংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা ধরে রাখতে কী ধরনের উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

শাস্ত্রীয় সংগীত ও নজরুল সংগীতের চর্চাকে আরও শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উদ্যোগ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার নজরুল সংগীত ও নজরুলের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ ও প্রসারে বিভিন্ন প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি নিয়মিত মানসম্মত অনুষ্ঠান, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং নতুন শিল্পীদের জন্য আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।

যেসব তরুণ-তরুণী সংগীতকে পেশা হিসেবে নিতে চান, বিশেষ করে নজরুল সংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে এগিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী হবে?

যারা সংগীতকে পেশা হিসেবে নিতে চান, তাদের বলব- এই পথ সহজ নয়, তবে অত্যন্ত সুন্দর। নিয়মিত সাধনা, পবিত্রতা, ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার মানসিকতা থাকলে সাফল্য অবশ্যই আসবে। আজকের ডিজিটাল যুগে একটি ভালো পরিবেশনা মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে পৌঁছে যেতে পারে। তাই জনপ্রিয়তার আগে নিজের মান, সততা ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসাকে গুরুত্ব দিন।


মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ