চাঁদা না পেয়ে হামলা-ভাঙচুরের পর এজেআর কুরিয়ারের গাড়িতে আগুন
চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে একের পর এক হামলার অভিযোগের মধ্যে এবার রাজধানীর রায়েরবাজারে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের একটি কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে গাড়িতে থাকা গ্রাহকদের পণ্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রসহ অধিকাংশ মালামাল পুড়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে এ ঘটনায় এক থেকে দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে রায়েরবাজার আড়তের সামনে এ ঘটনা ঘটে। মোহাম্মদপুর থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আলতাফ অগ্নিসংযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
এএসআই আলতাফ জানান, আগুন দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে চেষ্টা চলছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তাঁরা ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
এজেআর গ্রুপের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) জয়ন্ত চৌধুরী অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সন্ত্রাসী চক্র তাঁদের প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছে। দাবি অনুযায়ী অর্থ না দেওয়ায় বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ও পরিবহনযানে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
তিনি জানান, এর আগে নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠানের একটি কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। পরে রাজধানীর শাহবাগ ও রায়েরবাজারে প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। মিরপুরে পেট্রলবোমা ছুড়ে এক কর্মীর শরীরে আগুন দিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সর্বশেষ রায়েরবাজারে কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ মালামাল এবং নথিপত্র নষ্ট হয়েছে।
জয়ন্ত চৌধুরী বলেন, প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ এক থেকে দেড় কোটি টাকা। তবে পুড়ে যাওয়া ব্যাংক ও বিমাসংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং অন্যান্য মালামালের মূল্য নিরূপণ করা হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর দাবি, এজেআরের অধিকাংশ কর্মী নিম্ন আয়ের মানুষ। ধারাবাহিক হামলা ও অগ্নিসংযোগের কারণে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হলে তাঁদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কর্মীদের নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চান তিনি। পাশাপাশি হামলা ও নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
এর আগে গত ২০ অক্টোবর রাজধানীর হাজারীবাগে এজেআর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেডের একটি ওয়্যারহাউসে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল ওই হামলায় অংশ নেয় এবং প্রায় ৩১ লাখ টাকা মূল্যের সরঞ্জাম নিয়ে যায়।
ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ডাকাতির মামলা করতে চাওয়া হলেও পুলিশ জানিয়েছিল, হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল চাঁদা আদায়। এ কারণে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা নেওয়ার কথা জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পরদিন ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন হাজারীবাগ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ৭০ থেকে ৮০ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ দায়েরের পর অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি মুঠোফোনে তাঁকে হত্যার হুমকি দেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগে বলা হয়, ঘটনার দিন মুখে মাস্ক ও মাথায় হেলমেট পরা ব্যক্তিরা ৩৫ থেকে ৪০টি মোটরসাইকেলে করে ওয়্যারহাউসের পশ্চিম গেটে আসেন। তাঁদের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ জন সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। অন্যরা বাইরে অবস্থান নেন। হামলাকারীদের আট থেকে নয়জনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র এবং দু-তিনজনের হাতে শর্টগানসদৃশ অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা একটি সিসকো কোর ডিভাইস, একটি রাউটার, বিভিন্ন সক্ষমতার নয়টি ডাহুয়া এনভিআর, ১০ টেরাবাইট ধারণক্ষমতার ৩৮টি হার্ডডিস্ক, একটি সার্ভার র্যাক, ৪০টি ক্যামেরা, আটটি সিপিইউ, আটটি মনিটর ও একটি ল্যাপটপ নিয়ে যান। এসব সরঞ্জামের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩১ লাখ টাকা।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ১৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে ওয়্যারহাউসে গিয়ে অপারেশন ম্যানেজার নিজাম উদ্দিনের খোঁজ করেন। তাঁকে না পেয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চলে যান তাঁরা। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগে জুয়েল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের অন্য একটি কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট ও দখলের পরিকল্পনার কথা জানানোর বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার পর সাইফুল নামের এক ব্যক্তি ফোন করে লুটপাটের ঘটনা ধামাচাপা দিতে হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন আফসার উদ্দিন। এর আগেও ক্যাপ্টেন ইমনের নাম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটির কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
একের পর এক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা এবং কুরিয়ার সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সর্বশেষ অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
মতামত দিন