২০৩০ সালের মধ্যেই কি পশু-পাখির ভাষা অনুবাদ করবে এআই, বাস্তব সম্ভাবনা কতটুকু?
শুধু মানুষের ভাষা বিশ্লেষণেই আর সীমাবদ্ধ নেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এখন প্রাণিজগতের যোগাযোগ সংকেত পাঠোদ্ধারেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই প্রযুক্তি। এই গবেষণা সফল হলে ভবিষ্যতে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে যোগাযোগের এক নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষকরা মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণীদের শব্দ ও ডাকের বিশাল সংগ্রহ বিশ্লেষণ করছেন। হাজারো রেকর্ডিংয়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এমন সব সংকেত এআই শনাক্ত করছে, যা মানুষের কানে ধরা প্রায় অসম্ভব। কাক, তিমি ও নেকড়েসহ বিভিন্ন প্রাণীর ওপর এই গবেষণা চলছে।
কাকের ভাষা পাঠোদ্ধারে এআই
স্পেনে প্রায় তিন দশক ধরে ক্যারিয়ন কাক নিয়ে গবেষণা করছেন জীববিজ্ঞানী ভিত্তোরিও বাগলিওনে। ২০১৮ সালে তিনি ও তার সহকর্মী দানিয়েলা কানেস্ত্রারি ৪৩টি কাকের গায়ে ক্ষুদ্র মাইক্রোফোন বসিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপরিণত কাকদের কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার অডিও ফাইল সংগ্রহ করেন তারা, যা হাজার হাজার ঘণ্টার রেকর্ডিংয়ের সমান। আর্থ স্পিসিস প্রজেক্টের তৈরি একটি বিশেষ এআই মডেল ব্যবহার করে গবেষকরা এই বিপুল উপাত্ত থেকে কাকের নির্দিষ্ট ডাক আলাদা করে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রাণীদের সঙ্গে কি সত্যিই কথা বলতে পারবে মানুষ?
এই গবেষণার সম্ভাব্য পরিধি বিস্তৃত। গবেষকরা নতুন ধরনের প্যাটার্ন খুঁজে বের করতে অডিও ও ভিজ্যুয়াল তথ্যের সঙ্গে প্রাণীর আচরণগত তথ্যও একত্র করছেন। এই গবেষণার একজন প্রভাবশালী সমর্থক জেরেমি কোলার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ সম্ভব হতে পারে।
তবে প্রাণীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষের কথার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। শব্দ ছাড়াও প্রাণীরা গন্ধ, শরীরের রং, অঙ্গভঙ্গি এমনকি শব্দতরঙ্গও ব্যবহার করে। তাই শুধু শব্দ অনুবাদ করলেই চলবে না; এআইকে একই সঙ্গে প্রাণীর পরিবেশ ও সামগ্রিক আচরণও বুঝতে হবে।
কাকের বাইরেও তিমি ও প্রাইমেট নিয়ে গবেষণা
আর্থ স্পিসিস প্রজেক্ট একাই এ কাজে যুক্ত নয়। প্রশান্ত মহাসাগরে হাম্পব্যাক তিমি এবং বন্দি অবস্থায় থাকা বনমানুষদের নিয়েও একই ধরনের গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, তিমিরা এমন নির্দিষ্ট ধরনের ক্লিক শব্দ ও সুরের বিন্যাস ব্যবহার করে, যা অর্থবহ বলে মনে হয়; আবার প্রাইমেটরা শিকারি প্রাণী সম্পর্কে একে অপরকে সতর্ক করতে নির্দিষ্ট ধরনের ডাক ব্যবহার করে বলে দেখা গেছে। এসব প্রজাতির ওপর এআই অ্যালগরিদম প্রয়োগ করে গবেষকরা তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাকরণের মতো কাঠামো শনাক্ত করার আশা করছেন, যা তাদের সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও আবেগঘন জীবন সম্পর্কে গভীর ধারণা দিতে পারে।
এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি
এই যুগান্তকারী অগ্রগতির সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক নিয়েও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মোর-দ্যান-হিউম্যান লাইফ’ কর্মসূচির পরিচালক সিজার রদ্রিগেজ-গারাভিতো সতর্ক করে বলেন, প্রাণীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা একবার বোঝা গেলে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বৃহৎ পরিসরে তাদের প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে এআই ব্যবহৃত হতে পারে, যা প্রাণিজগতের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মতামত দিন