এআইয়ের কারণে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে: বিল গেটস
মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহারে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, যাতে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু জরুরি মুহূর্তে এআই বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা—যাকে ‘কিল সুইচ’ বলা হয়—যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তিটির কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ এবং এর মধ্যেই নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
রোববার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গেটস বলেন, তিনি কিল সুইচের বিরোধী নন। তবে এআইয়ের ক্ষতিকর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সেটি কী করছে, সে বিষয়ে নজরদারি ও রেকর্ড রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
গেটস বিশেষভাবে এআই ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সর্বাধুনিক এআইয়ের সঙ্গে অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষের সংযোগ এমন শক্তিশালী অস্ত্র তৈরি করতে পারে, যার নজির আগে দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, এআই এমন ঘটনা ঘটানোর সক্ষমতা রাখে, যার ফলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। যদিও পুরো মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করা কঠিন, তবু অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুতর।
এআইয়ের নিরাপত্তাবিধি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অগ্রগতির গতি কমিয়ে দেবে—এমন আশঙ্কাও নাকচ করেছেন গেটস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এআই উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে—এমন উদ্বেগ থাকলেও নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না।
গেটসের মতে, গবেষণাগারগুলোতে এআই মডেলের আচরণ সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, এআই নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য তৈরি করা শীতল যুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা ও চুক্তির চেয়েও কঠিন হতে পারে।
গেটসের মতে, তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের এআই ব্যবহার করে সাইবার হামলা চালানো, ব্যাংক হিসাবের তথ্য এলোমেলো করা কিংবা বিদ্যুৎ গ্রিড বন্ধ করে দেওয়া। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে এআইয়ের সাহায্যে ছোট ছোট গোষ্ঠী এমন কাজ করতে পারে, যা আগে কেবল বড় রাষ্ট্রগুলোর পক্ষেই করা সম্ভব ছিল।
তিনি বলেন, এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে সরকারগুলোকে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তা না হলে বড় ধরনের নেতিবাচক ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্প এআই উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র চীন ও অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছে এবং এগিয়ে থাকবে।
গেটস বলেন, নিরাপত্তার মানদণ্ড নিয়ে বৈশ্বিক ঐকমত্য তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, পরিবেশনীতি ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে অতীতের আন্তর্জাতিক চুক্তির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এআইয়ের ক্ষেত্রেও মানবজাতিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন মহলেও এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অ্যানথ্রপিকের সাবেক কর্মী জ্যাকব কক্সন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, এআই তৈরি করা ব্যক্তিরা আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করেন, এই দশক শেষ হওয়ার আগেই প্রযুক্তিটি মানবজাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড্যারিও আমোদেই এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানসহ প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীরাও এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। আমোদেই এক ব্লগ পোস্টে লিখেছেন, শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর উচিত আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপত্তার মানদণ্ড নিয়ে সমন্বয় করা, পাশাপাশি চীনের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বজায় রাখা।
মার্কিন আইনপ্রণেতারাও অন্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে এআইয়ের নিয়ম তৈরির পক্ষে কথা বলেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রো খান্না এনবিসিকে বলেন, এআইয়ের ঝুঁকি মূল্যায়নে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের যৌথ কারিগরি কর্মীগোষ্ঠী গঠন করা উচিত।
খান্নার মতে, নিজেকে নিজে উন্নত করতে পারে—এমন এআই মডেল নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে পারে, যা বাস্তবায়নযোগ্য ও যাচাইযোগ্য হবে এবং শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষণাগারগুলোর ওপর নজরদারির ব্যবস্থা রাখবে।
ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই দেশ এআইয়ের ঝুঁকি মূল্যায়নে একটি কার্যকর সংলাপ শুরু করেছে। এ বিষয়ে আরও আলোচনা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে গেটস দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর অতীত যোগাযোগ নিয়েও কথা বলেন। বিচার বিভাগের প্রকাশ করা নথিতে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার পর এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়।
গেটস বলেন, এপস্টিন তাঁকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে শত শত কোটি ডলার সংগ্রহে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এপস্টিনের সঙ্গে সময় কাটানোর কারণে তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে সহায়তা হয়ে থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন গেটস। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
মতামত দিন