এআই যুগে ব্যাংকারদের নতুন বাস্তবতা: দক্ষতা না বাড়ালে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি
বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং খাত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়, এটি ইতোমধ্যেই ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠেছে। ঋণ বিশ্লেষণ, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, গ্রাহকসেবা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ডকুমেন্ট প্রসেসিং— সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে ব্যাংকিং পেশাজীবীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া।
সম্প্রতি লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী চার্লি নান বলেছেন, এআই অনেক কাজের ধরন বদলে দেবে। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, ভবিষ্যতের ব্যাংকিংয়ে সফল হতে হলে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যারা পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবেন, তারাই ভবিষ্যতের ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্ব দেবেন।
কেন নতুন দক্ষতা এত গুরুত্বপূর্ণ?
এআই এমন অনেক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ খুব দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে করতে পারে, যা আগে ব্যাংক কর্মকর্তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিয়ে করতেন। উদাহরণস্বরূপ—
• কেওয়াইসি ও ডকুমেন্ট যাচাই
• ঋণের প্রাথমিক মূল্যায়ন
• গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর প্রদান
• প্রতারণা শনাক্তকরণ
• রিপোর্ট প্রস্তুতকরণ
এর অর্থ এই নয় যে ব্যাংকারদের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে। বরং তাদের কাজের ধরন বদলে যাবে। ভবিষ্যতের ব্যাংকারকে তথ্য বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গ্রাহক পরামর্শ, জটিল সমস্যা সমাধান এবং এআইয়ের ফলাফল যাচাই করার মতো উচ্চমূল্যের কাজ করতে হবে।
ভবিষ্যতে ব্যাংকারের কী কী দক্ষতা থাকা দরকার?
আগামী দিনের ব্যাংকিংয়ে শুধু প্রচলিত ব্যাংকিং জ্ঞান যথেষ্ট হবে না। একজন দক্ষ ব্যাংকারের প্রয়োজন হবে:
• এআই ও ডেটা অ্যানালিটিক্স সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
• প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মৌলিক দক্ষতা
• ডিজিটাল ব্যাংকিং ও অটোমেশন বোঝার সক্ষমতা
• সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা
• সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা
• গ্রাহকের জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক আর্থিক পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতা অর্থাৎ প্রযুক্তি ও মানবিক দক্ষতার সমন্বয়ই হবে ভবিষ্যতের সফল ব্যাংকারের পরিচয়।
কর্মী ছাঁটাই নাকি নতুন সুযোগ?
এআই নিয়ে অনেকের আশঙ্কা, এটি চাকরি কমিয়ে দেবে। বাস্তবে কিছু রুটিনভিত্তিক কাজের প্রয়োজন কমতে পারে। তবে একই সঙ্গে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। যেমন: এআই স্পেশালিস্ট, ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই গভর্ন্যান্স এক্সপার্ট, মডেল ভ্যালিডেটর, ডিজিটাল রিস্ক ম্যানেজার, এআই অডিটর ইত্যাদি ।বিশ্বের বড় ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যেই হাজার হাজার কর্মীকে নতুন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং এই খাতের বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য শিক্ষা:
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও এআই ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। ক্রেডিট স্কোরিং, জালিয়াতি প্রতিরোধ, গ্রাহকসেবা, কল সেন্টার, ডকুমেন্ট যাচাই এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। তাই এখন থেকেই ব্যাংকগুলোর উচিত:
• কর্মীদের নিয়মিত এআই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
• প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
• মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা।
• এআই ব্যবহারের পাশাপাশি মানবিক তদারকি নিশ্চিত করা।
এআই ব্যাংকারদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং এটি একটি শক্তিশালী সহকারী। তবে যারা নতুন প্রযুক্তি শিখবেন না এবং নিজেদের দক্ষতা উন্নত করবেন না, তারা ভবিষ্যতের ব্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়তে পারেন। অন্যদিকে যারা শেখার মানসিকতা নিয়ে এআইকে কাজে লাগাবেন, তারাই আগামী দিনের ব্যাংকিং খাতের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান মানবসম্পদ হয়ে উঠবেন। প্রযুক্তি বদলাবে, কিন্তু শেখার ক্ষমতা ও অভিযোজনই একজন পেশাজীবীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
মতামত দিন