বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তর হচ্ছে আহমদ ছফার কবর
বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত চিন্তক ও লেখক আহমদ ছফার কবর মিরপুরের সাধারণ কবরস্থান থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। পরিবারের আবেদনের পর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডিএনসিসির ১৪তম করপোরেশন সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি লেখকের পরিবারের পক্ষে তার ভ্রাতুষ্পুত্র নূরুল আনোয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে কবর স্থানান্তরের আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, শিল্প, সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতিতে অসামান্য অবদান থাকা সত্ত্বেও আহমদ ছফাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। তাই তাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা প্রয়োজন।
গত ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত করপোরেশন সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় উপস্থিত সদস্যরা কবর স্থানান্তরের পক্ষে মত দেন। বর্তমানে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে নূরুল আনোয়ার বলেন, আহমদ ছফার মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারের ইচ্ছা ছিল তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা। কিন্তু তৎকালীন প্রশাসনের অনীহার কারণে তা সম্ভব হয়নি। আহমদ ছফার মতো একজন ব্যক্তিত্বকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াই ছিল আমাদের আবেদনের মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও জানান, ব্যক্তিগতভাবে তিনি লেখকের বর্তমান কবরের জায়গাটি ৯৯ বছরের জন্য বরাদ্দ নিয়েছিলেন। তবে একজন দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীর জন্য স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান নিশ্চিত করাকে তিনি নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন।
আহমদ ছফার কবর স্থানান্তরের উদ্যোগকে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল বলে মন্তব্য করেছেন প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, ২০০১ সালের ২৮ জুলাই আহমদ ছফার মৃত্যুর পর তাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন সাধারণ গোরস্তানে শায়িত থাকা ছিল এক ধরনের অপূর্ণতা। দেরিতে হলেও রাষ্ট্র তাকে যোগ্য মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে ভিন্নমতও রয়েছে। প্রাবন্ধিক ও সমালোচক মোরশেদ শফিউল হাসান মনে করেন, একজন লেখকের মর্যাদা তার কবরের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না। তার মতে, আহমদ ছফার সমাধি যদি জন্মস্থান চট্টগ্রামের চন্দনাইশের গাছবাড়িয়ায় হতো, তাহলে হয়তো লেখক নিজেই বেশি আনন্দিত হতেন।
১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশে জন্মগ্রহণ করেন আহমদ ছফা। তিনি গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন।
বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে তার লেখাগুলো আজও ব্যাপকভাবে আলোচিত। ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ এবং ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থ দুটি বাংলা চিন্তাজগতে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। প্রবন্ধ, উপন্যাস, কবিতা ও অনুবাদ—সাহিত্যের নানা শাখায় তার অবদান তাকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মননশীল লেখকে পরিণত করেছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে