২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে ফিরেছেন জেলেরা, বাড়ছে ইলিশের সরবরাহ
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আবারও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে নেমেছেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর বিপুলসংখ্যক জেলে সাগরে ফিরেছেন। কাঙ্ক্ষিত ইলিশের আশায় সাগরের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে মাছ ধরার নৌকা।
ইতোমধ্যে জেলেদের ধরা মাছ নদীতীরের আড়তগুলোতে আসতে শুরু করেছে। কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর আবারও সরব হয়ে উঠেছে মাছের ঘাট। প্লাস্টিকের ট্রেতে করে ইলিশ, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আনা হচ্ছে। মাছের নিলামকে কেন্দ্র করে আড়তগুলোতে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য।
নিষেধাজ্ঞার সময় প্রায় তিন সপ্তাহ অলস কাটানো ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা এখন চট্টগ্রাম নগরের ফিরিঙ্গি বাজারের মাছের আড়তে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে ইলিশের দাম প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। বড় আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে নিষেধাজ্ঞার আগের দামেই।
শনিবার সকাল ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত নগরের ফিশারিঘাটে মাছ ধরা ও বেচাকেনার চিত্র দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টার পর অনেক জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। ভোরে তাদের নৌকাগুলো কোতোয়ালি এলাকার পাশের ফিশারিঘাটে ফিরতে শুরু করে।
ঘাটটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮০টি ইলিশের আড়ত রয়েছে। জেলেরা মাছ ধরে এসব আড়তে নিয়ে আসেন। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই নিলামের মাধ্যমে মাছ বিক্রি হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বিক্রির জন্য খুব কম মাছই সংরক্ষণ করা হয়।
ঘাটে দুই ধরনের ব্যবসায়ী তাজা ইলিশ কেনেন। স্থানীয় খুচরা বিক্রেতারা ফিশারিঘাটেই মাছ বিক্রি করেন। অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা মাছ কিনে বিভিন্ন উপজেলায় নিয়ে যান।
ঘাটসংলগ্ন বাঁশখালী গ্রামের জেলে মো. হারুন জানান, রাতে মাছ ধরতে গিয়ে ভোরে ১২ হাজার ৮০০ টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এভাবে ইলিশ ধরা অব্যাহত থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারব।’ মৌসুমের বাকি সময়েও ইলিশের সরবরাহ ভালো থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আরেক জেলে জহিরুল ইসলাম জানান, ১১ জন জেলে রাত ১২টার দিকে মাছ ধরতে গিয়ে ২৭ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তারা আবার নদীতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে কয়েক দিনের মধ্যে ইলিশের সরবরাহ কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আড়তদার সালাউদ্দিন বলেন, চাহিদা বেশি থাকায় শিগগিরই ইলিশের দাম কমার সম্ভাবনা নেই। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। আর ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়।
তিনি জানান, ইলিশের পাশাপাশি কিছু জেলে পাঙ্গাসও ধরছেন। বড় পাঙ্গাসের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার টাকা। ছোট পাঙ্গাস বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। আগামী কয়েক দিনে মাছের আহরণ বাড়লে দাম কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
আরেক আড়তদার মো. আবদুর রহিম বলেন, আজ সকাল থেকেই ঘাটে মাছ আসতে শুরু করেছে। তবে মাছের সরবরাহের প্রকৃত চিত্র আজ ও আগামীকাল বোঝা যাবে। আগের বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দুই দিন মাছের সরবরাহ বেশি থাকলেও পরে তা কমে আসত।
আড়তদার আবদুল জলিল বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে ঘাটে বড় আকারের ইলিশ তুলনামূলক বেশি আসছে। তবে ছোট ইলিশের সরবরাহ খুবই কম। ইলিশের আহরণ এখনো সীমিত হলেও পাশাপাশি পাঙ্গাস ধরতে পারায় জেলেরা কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারছেন।
প্রবীণ মাছ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, বছরের এই সময়ে আগে নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। তবে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি বলে তিনি আক্ষেপ করেন। তাঁর দাবি, কিছু জেলে এখনো মা ইলিশ ধরছেন।
চট্টগ্রামের সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, ইলিশ রক্ষায় দুটি অভিযান কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সুফল পাচ্ছেন জেলেরা। এর একটি হলো ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা নিষিদ্ধ রাখা। অন্যটি হলো আগামী বছরের নভেম্বর মাসে মা ইলিশ না ধরার নির্দেশনা।
মতামত দিন