বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কিছু অস্বস্তি নিরসন করা অত্যন্ত প্রয়োজন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বিদ্যমান কিছু ‘অস্বস্তি’ দূর করা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ সরকার বর্তমানে পর্যালোচনা করছে। পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
বুধবার (২৯ জুলাই) ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আমন্ত্রণের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সেটা এখন রিভিউ (পর্যালোচনা) করছি। এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব এবং আপনাদের সেটা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ নিয়েও পর্যালোচনা চলছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একাধিক দাওয়াত আছে। সে সবগুলো তো অনেক সময় ধরে... উনি যেমন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাবেন, সব কিছু আমাদের সামগ্রিকভাবে দেখতে হচ্ছে।
ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. খলিলুর রহমান বলেন, ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনারের সঙ্গে এটি ছিল আমার প্রথম সাক্ষাৎ। এটি একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমার সঙ্গে ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার ত্রিবেদীর আজকে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। এটা ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ। আমরা বিস্তারিত কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করিনি। এটাই স্বাভাবিক, কারণ এর জন্য আমাদের সময় পড়ে আছে।’
দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, তবে দুই দেশের সম্পর্ক রিসেটের (নতুন করে শুরু) ব্যাপারে—এটা তো আমরা আগেও বলেছি—আমরা দুজনেই ঐকমত্য পোষণ করি। পারস্পরিক স্বার্থ সামনে রেখে এবং আমি বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে আগামীতে আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। এ বিষয়ে আমরা ঐকমত্য পোষণ করেছি।
পুশ-ইনসহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘না, আজকে আমরা কোনো বিশেষ বিষয়ে কথা বলি নাই। কিছু কিছু ইরিটেশন (অস্বস্তি) আছে, উনিও জানেন, আমিও জানি। এগুলো নিরসন করা খুবই প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনীয়তা তো সকলেই উপলব্ধি করেন।’
ভারতে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আজকে আগেই বলেছি, এটা একটা সৌজন্য সাক্ষাৎ। উনি নিজেকে আমাদের কাছে উপস্থাপন করলেন সরকারিভাবে। এই প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি দেখা করলেন। আপনাদের বললাম একটু আগে যে আমরা বিশেষ কোনো ইস্যু নিয়ে এবার কথা বলিনি। আমাদের মধ্যে যে বিষয়গুলো আছে, আগামী দিনগুলোতে সব নিয়েই আমরা আলোচনা করব।’
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে খলিলুর রহমান বলেন, ‘অজিত দোভাল সাহেবের সঙ্গে আমার ম্যানিলাতে দেখা হয়নি, জয়শঙ্কর সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এবং সাধারণভাবে উনি জানেন যে মিস্টার ত্রিবেদীর সঙ্গে আমার বৈঠক আছে। আমরা দুজনেই আশা প্রকাশ করেছি যে আগামী দিনগুলোতে আমাদের সম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই কাজ করবে।’
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফরের আগের দিন ভারতীয় হাইকমিশনারের এ সাক্ষাতের কোনো বিশেষ তাৎপর্য আছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘না, এটার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। আমি গতকাল ফিরে এসেছি এবং যারা যারা উনার সঙ্গে আমার মিটিংটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল, আমি যত দ্রুত সম্ভব সে মিটিংটা করে নিয়েছি।’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূতের আসন্ন সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে আমার ইতোমধ্যে ম্যানিলাতে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, বৈঠক হয়েছে। আমরা দুই দেশের সম্পর্ক পর্যালোচনা করেছি।
‘আপনারা জানেন, আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমুখী। তারাও চাইছেন সম্পর্কটাকে আরও এগিয়ে নিতে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘উনি (সার্জিও গোর) কেবল ভারতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত না, উনি আমেরিকান প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিষয়ভিত্তিক প্রতিনিধি। এটি তার প্রথম সফর। দক্ষিণ এশিয়া যেহেতু তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, বাংলাদেশও তার অন্তর্ভুক্ত। প্রথম সফর হিসেবে আমরা ধারণা করছি এটা এক্সপ্লোরেটরি (অনুসন্ধানমূলক) সফর হবে। উনি বাংলাদেশ সম্পর্কে বুঝতে চাইবেন। শুধু আমাদের সঙ্গে না, অন্যান্য অনেক স্টেকহোল্ডারের (অংশীজন) সঙ্গেও কথাবার্তা বলবেন।’
রোহিঙ্গা ইস্যু প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে উনি অবগত আছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে যে বৈদেশিক সহায়তা আমরা পেয়েছি, তার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার পরিমাণ সর্বাধিক। আমরা সেটা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করি। উনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাবেন বলে আমরা আশা করছি।’
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সম্ভাব্য সফর নিয়ে কোনো চাপ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘আমরা কোনো ধরনের চাপ অনুভব করছি না।’
বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আমার মনে হওয়ার বিষয় নয়, কূটনীতিতে আমরা আন্দাজে কাজ করি না। আমরা বাস্তবতার ভিত্তিতে কাজ করি।’
ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘কোনো দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অন্য দেশের পরিপ্রেক্ষিতে জিরো-সাম গেম নয়। একজনের সম্পর্ক ক্ষতি করে আরেকজনের সম্পর্ক বৃদ্ধি করছি—আমরা কখনোই সেটা করব না। সব দেশের সঙ্গে আমাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে, নিজেদের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে আমরা সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করেছি। কারো সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই এই নয় যে আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত ভালো সফর হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি ভারতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যান, আমরা আশা করব সেই সফরটিও অত্যন্ত ভালো হোক। আবার মার্কিন প্রতিনিধির সফরও আমাদের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অংশ। বাংলাদেশের সঙ্গে তো একটা দেশের না, বহু দেশের সম্পর্ক আছে। এটা তো স্ত্রী এবং সতীনদের মধ্যে মারামারি নয় ভাই! এটা হচ্ছে স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক। যেখানে আমাদের স্বার্থ, আমরা সেখানে যাব।’
মতামত দিন