বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নামতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা: এডিবি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর আগে জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল এডিবি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ হালনাগাদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে দেশের প্রবৃদ্ধির পথে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এডিবির মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহের ওপর চাপ তৈরি করছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া এবং ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার যুক্ত হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের গতি কমছে।
ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ রাখতে বেশি আগ্রহী হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান আরও সীমিত হতে পারে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরির গতিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্প খাতেও চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাজারে চাহিদার দুর্বলতা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ঘাটতি শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে বলে মনে করছে এডিবি।
প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
জ্বালানি, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বাড়লে পণ্য ও সেবার দাম আরও বাড়তে পারে। সম্প্রতি ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের খুচরা দাম বাড়ানোর বিষয়টিও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচও বাড়তে পারে।
আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিও অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে সারের সীমিত প্রাপ্যতা এবং জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হলে কৃষি খাতেও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে।
এডিবির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে ব্যক্তিগত ভোগ ও প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবাসী আয় বাড়লে মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সেই বাড়তি আয়ের একটি অংশ ক্ষয় করে দিতে পারে। ফলে আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ততটা বাড়বে না।
বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। উচ্চ সুদহার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি ঘাটতি এবং ব্যবসায়িক আস্থার সংকট বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিতে পারে। সরকারি বিনিয়োগ থেকেও বড় ধরনের সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত বলে মনে করছে এডিবি। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সরকারি বিনিয়োগের প্রভাবও সীমিত থাকতে পারে।
রপ্তানি খাত ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে আশা করছে এডিবি। তবে বৈশ্বিক বাজারে দুর্বল চাহিদা ও বাণিজ্যসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে থাকবে। অন্যদিকে শিল্প উৎপাদনের জন্য জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়তে পারে, যা একদিকে উৎপাদন কার্যক্রমে সহায়তা করবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
শিল্প ও কৃষি খাতে চাপ থাকলেও পরিষেবা খাত তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। আগামী অর্থবছরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। প্রবাসী আয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদার কিছুটা পুনরুদ্ধার এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার কারণে পরিষেবা খাত এই প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একই সময়ে কম প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা না গেলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
মতামত দিন