‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এডাব-এর আলোচনা সভা’
“সকল নারী ও কন্যা শিশুর জন্য প্রয়োজন অধিকার, ন্যায় বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ৮ই মার্চ এডাব (এসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ ইন বাংলাদেশ)-এর আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এডাব চেয়ারপারসন আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে আগারগাঁও এর এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. সাদিয়া শারমিন, অতিরিক্ত সচিব, পরিকল্পনা বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মারিয়া সালাম, বার্তা সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ; কাজী বেবী, নির্বাহী পরিচালক, পিডাপ ও কোষাধ্যক্ষ, এডাব; রাবেয়া সুলতানা, প্রোগ্রাম এডভাইজার, গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে), সৈয়দা শামীমা সুলতানা, নির্বাহী পরিচালক, কেএইচআরডিএস ও কার্যনির্বাহী সদস্য, এডাব। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, তাহমিনা বাশার নাজনীন, কর্মসূচি কর্মকর্তা, এডাব। সঞ্চালনায় ছিলেন এডাব এর কর্মসূচি পরিচালক জনাব কাউসার আলম মুন্সী।
প্রধান অতিথি হিসেবে ড. সাদিয়া শারমিন বলেন, নারীর অধিকার মানবাধিকার। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী বিবেচনায় তাদের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে। নারীর অধিকার, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, এনজিও সহ সকল প্রতিষ্ঠানকে কাগুজে কলমে নয়, বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে তা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি বা পারিনি, বাধা কোথায়, তা বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে মারিয়া সালাম বলেন, নারীর অধিকার রক্ষা, বৈষম্য নিরসন, নির্যাতন বন্ধে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব । রাষ্ট্রকে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন করতে হলে তাকে ক্ষমতায় আসতে হবে উল্লেখ করে কাজী বেবী বলেন, প্রান্তিক নারীদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ; স্থানীয় সরকারে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো; কৃষি নারী, খাস জমি, সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করা; স্কুলে ভোকেশনাল ট্রেনিং নিশ্চিত করা; সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাবেয়া সুলতানা বলেন, নারীর অধিকার রক্ষা, বৈষম্য নিরসনে দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নারীর ক্ষমতায়ন। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের পিছনে রয়েছে মানুষ। সবার আগে তাই মানুষের মনস্তাত্বিক পরিবর্তন আনতে হবে। বয়স্ক নারীরা আশ্রিতা হিসেবে অবহেলিত জীবন যাপন করে উল্লেখ করে ইউএনএফপি এর এক গবেষণাকে উল্লেখ করে তিনি তাদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য সেবা চালু করার দাবী করেন।
বক্তারা তাদের আলোচনায় বলেন, নারীর দুর্গতি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত, যা পরিবার থেকেই শুরু হয়। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী নানাভাবে নির্যাতন, হেনস্তা, হয়রানি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বাল্যবিবাহ বন্ধ হচ্ছে না, গৃহশ্রমিক, শ্রমজীবী, প্রবাসী নারী কর্মীরা নির্যাতিত হচ্ছে, শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছে না। সোশ্যাল মিডিয়া এখন নারীদের নিয়ে নেতিবাচক কথা লেখা ও সাইবার বুলিং এর উর্বর ক্ষেত্র । শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ কেউ ধর্ষণ থেকে রেহাই পায় না। এমনকি বাবার কাছে সন্তান নিরাপদ নয়, যা খুব লজ্জার। রাজনৈতিক দল নারীদের মনোনয়নে খুব মনোযোগী নয়, অন্যদিকে সংরক্ষিত আসন নারীদেরকে আরও সংরক্ষিত করে ফেলছে। মব জাস্টিস এ নারীকে ভয়াবহভাবে হেনস্তা করতে দেখা গেছে। ঘর থেকেই শুরু হয় নারীর অবদমন।
তারা বলেন, বিভিন্ন সংকটে নারী পরিবার, সন্তানকে আগলে রেখে যেভাবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছে তা প্রমাণ করে নারী দুর্বল নয়। নারীরা আজ সব ধরনের কাজে নিয়োজিত। নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে যার যার জায়গা থেকে সম্মিলিতভাবে সবাইকে কথা বলা, আওয়াজ তুলতে হবে, সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন সুপারিশ হিসেবে, নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ করতে নারী-নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, জিরো টলারেন্স (Zero tolarance) ও টাস্কফোর্স ঘোষণা করা; জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করতে করা; সংরক্ষিত আসন সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি করা; অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং ও তথ্য অপব্যবহার রোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নারীর সুরক্ষায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও ক্যাম্পেইনের আয়োজন; নারীর অবৈতনিক পারিবারিক কাজের স্বীকৃতি দিয়ে তা জিডিপিতে অর্ন্তভূক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা; নারী গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং এ বিষয়টিকে শ্রম আইনে অর্ন্তভূক্ত করতে হবে। পুত্র সন্তানের অবর্তমানে মেয়ে সন্তানের সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা; এফিডেবিডের মাধ্যমে কন্যা সন্তানের বয়স বাড়ানো আইনত নিষিদ্ধ করা; ধর্ষকের সাথে বিবাহ দেওয়া বন্ধ করা; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা; শিশুদের লালন পালনের জন্য সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে সাপোর্ট সিস্টেমের ব্যবস্থা করা; স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা এবং প্রচলিত আইণের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
সভার শেষের দিকে এডাব এর পরিচালক জনাব একেএম জসীম উদ্দিন আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।
সমাপনী বক্তব্যে সভাপতি বলেন, আজকে নারীর শক্তি, সংগ্রাম, অর্জন উদযাপনের দিন। আমাদের কাজ হলো নারীর কণ্ঠস্বর জোরালো করা, নেতৃত্বকে দৃঢ় করা। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে ছেলে হোক মেয়ে হোক ন্যায় নীতি শিক্ষায় শিক্ষিত করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবো।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে