১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা
অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বক্তব্য দিলেন আসামি, খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনায় করা মামলার আসামি মাদ্রাসাশিক্ষককে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। একাধিক অভিযান চালিয়েও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে অজ্ঞাত স্থান থেকে ওই শিক্ষকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মদন থানার উপপরিদর্শক আখতারুজ্জামান জানান, শিশুটিকে একটি ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পরিবার অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে পুলিশের উদ্যোগে জেলা হাসপাতালে পরীক্ষা করেও অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আসামিকে গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত আছে।
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, আসামিকে গ্রেপ্তারে সোমবার রাত তিনটা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ মিনিট চার সেকেন্ডের ভিডিওতে ওই শিক্ষক বলেন, অসুস্থতার কারণে কথা বলা কঠিন হলেও বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন মনে করছেন। দেশের আইন ও বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল জানিয়ে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। মেয়েটি একসময় তার মাদ্রাসায় পড়লেও এই ঘটনার সঙ্গে তিনি কোনোভাবে জড়িত নন।
তিনি বলেন, ‘দেশের আইন আছে, সে আইন প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করবে। আপনারা অপরাধী খুঁজে বের করার আগেই যদি আমাকে অপরাধী বানিয়ে ফেলেন, তাহলে আসল অপরাধী পার পেয়ে যাবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা, এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষক চার বছর আগে একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুটি তার নানার বাড়িতে থেকে সেখানে পড়াশোনা করত। শিশুটির বাবা মাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে মা সিলেটে একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন।
শিশুটির মা বলেন, ‘আমাকে আমার স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। ছোট তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে খুব কষ্ট করি। জীবিকার তাগিদে সিলেটে মানুষের বাসায় কাজ করি। মেয়েকে আমার বাবার বাড়িতে রেখে কষ্ট করে মাদ্রাসায় পড়তে দিয়েছিলাম। কিন্তু হুজুর আমার এই শিশু বাচ্চার সঙ্গে এমন পিশাচের মতো কাজ করতে পারল — আমি কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবিনি। এই ঘটনায় আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
চিকিৎসককে হুমকি ও হয়রানি
শারীরিক পরীক্ষার পর শিশুটির অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি নিশ্চিত করা চিকিৎসক সাইমা আক্তারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তার স্বামী মো. আসিফুল ইসলাম বলেন, ‘দুদিন আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সাইমা বক্তব্য দেওয়ার পর থেকে তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। চিকিৎসক-সংক্রান্ত সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে, ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়ার এবং ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা দুজনেই এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছি।’
পুষ্টিকর খাবার দিলেন ইউএনও
আজ দুপুরে শিশুটির বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী। এ সময় তিনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুষ্টিকর খাবার ও নগদ অর্থ প্রদান করেন। তিনি জানান, মেয়েটি পুষ্টিহীনতাসহ শারীরিক বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। তাকে মানসিক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনি ও চিকিৎসাসংক্রান্ত সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার মামলা হলেও এখনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা না যাওয়ার বিষয়ে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। ঘটনা জানার পর পুলিশ উদ্যোগ নিয়ে শিশুটির মাকে সিলেট থেকে এনে মামলা করায়। তবে এর আগেই অভিযুক্ত শিক্ষক পরিবার নিয়ে পালিয়ে যান। শিগগিরই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে