শেখ হাসিনাকে সমর্থনের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে: এইচআরডব্লিউ
বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সংস্থাটির অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক অবস্থান বা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কাউকে শাস্তি দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী বলেও মনে করছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরে এইচআরডব্লিউ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অন্তত ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসব ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পুরোনো প্রবণতাই নতুন পরিস্থিতিতে ফিরে এসেছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক ও মতপ্রকাশের চর্চা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের আমলেও এ ধরনের চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। অতীতের দমন-পীড়নের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে একই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। এতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত ছাড়াই অন্তত ৪৪ জন শিক্ষককে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং আরও ১৪ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের মার্চে ১২৬ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার এবং তাঁদের পরীক্ষার সনদ আটকে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষককে বরখাস্ত, সাময়িক বরখাস্ত অথবা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৩৪ জনের পদাবনতি কিংবা শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং আরও ১০ জনকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ৮৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মশিউর রহমানের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের শিক্ষা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, ওই বছরের জুলাইয়ে একটি টেলিভিশন টকশোতে তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ‘অবৈধ, ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে টকশোর ভিডিও পর্যালোচনা করে এইচআরডব্লিউ এমন বক্তব্যের প্রমাণ পায়নি বলে জানিয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত উপাচার্যদের একটি বৈঠকে তিনি ‘গণহত্যায় উসকানি’ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ আনা হয়। মশিউর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে এমন বক্তব্য দেওয়ার কোনো প্রমাণ তাঁকে দেখানো হয়নি এবং তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের সুপারিশ করে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত একটি মিছিলের কথা উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিশন ওই মিছিলকে ‘সন্ত্রাসী মিছিল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিও পর্যালোচনা করে সংস্থাটি জানায়, সেখানে শিক্ষকদের স্লোগান দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেলেও কোনো সংঘর্ষ বা সহিংসতার দৃশ্য পাওয়া যায়নি।
ওই মিছিলে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক পূর্বা ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু পর্যালোচিত ভিডিওতে তাঁকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একই দিনে অ্যানিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকারকেও বরখাস্ত করা হয়। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পুরো সময় তিনি পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন না। পরে হাইকোর্ট তাঁর বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেন। তবে ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্যপদ, রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং টেলিভিশন আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগপন্থী একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন শিক্ষকের দণ্ডিত হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন কারাগারে রয়েছেন এবং অন্য একজন বিচারের অপেক্ষায় আছেন। তবে সংস্থাটি বলেছে, নির্দিষ্ট অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যেক ব্যক্তির ন্যায়বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে সমর্থন করার কারণে কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা দেশে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত না থাকারই ইঙ্গিত দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তা, মতবিনিময় ও জ্ঞানচর্চার জায়গা। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি সমর্থন আদায়ের পরিবেশ তৈরি করা উচিত নয়।
মতামত দিন