Views Bangladesh Logo

শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শায়িত আবুল কাসেম ফজলুল হক

দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলা একাডেমি এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শায়িত হলেন প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক ও সমাজ বিশ্লেষক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

সোমবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে তার দাফন সম্পন্ন হয় বলে জানান তার জামাতা আনোয়ারুল হাসান।

এদিন সকালে বাংলা একাডেমিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রথম জানাজা হয়। সেখানে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সহকর্মী, শিক্ষার্থী, লেখক, সাহিত্যিক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
একাডেমি থেকে মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেখানে বাংলা একাডেমির সভাপতির কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুরে মরদেহ নেওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। কিন্তু প্রবল বৃষ্টির কারণে সেখানে কফিন নামানো যায়নি। পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় কলা অনুষদের মূল ফটকে তার কফিনে শ্রদ্ধা জানান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিভিন্ন বিভাগ ও শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

দুপুর ২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে তার দ্বিতীয় জানাজা হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

রোববার দুপুরে পরিবারের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন আবুল কাসেম ফজলুল হক। দ্রুত একটি ক্লিনিকে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক জীবনের চার দশক অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির আহ্বায়কও ছিলেন তিনি।

তার জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায়। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

তার লেখা ২১টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’-এর মতো বই যেমন আছে, তেমনি আছে রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তার ফসল ‘নৈতিকতা: শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’, ‘যুগসংক্রান্তি ও নীতিজিজ্ঞাসা’, ‘মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘আশা-আকাঙ্ক্ষর সমর্থনে’, ‘বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’, ‘অবক্ষয় ও উত্তরণ’, ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি: সম্ভাবনার নবদিগন্ত’ ও ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’।

সাহিত্য নিয়ে তার কাজের মধ্যে ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য’, ‘বাঙলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য’, ‘সাহিত্যচিন্তা’, ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’, ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’, ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’ অন্যতম। অনুবাদগ্রন্থ ও কয়েকটি বইয়ের সম্পাদনাও রয়েছে তার।

আশির দশক থেকে ‘লোকায়ত’ নামে একটি মননশীল পত্রিকা সম্পাদনা করে আসছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। আহমদ শরীফ প্রতিষ্ঠিত স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন।

১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান এই লেখক। ২০২৪ সালে তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তার দুই সন্তানের মধ্যে শুচিতা শরমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর ফয়সল আরেফিন দীপন ছিলেন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী। ঢাকার শাহবাগে প্রকাশনা সংস্থাটির কার্যালয়ে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর তাকে হত্যা করে জঙ্গিরা।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ