সুরের পথেই ছিল স্বপ্ন, সড়কে থেমে গেল পেহেলি ভৈরবীর সেই পথ
কিছু কিছু বিদায় এতটাই আকস্মিক হয় যে, মৃত্যুর খবরটিও যেন বিশ্বাস হতে চায় না। ১৯ বছরের পেহেলি ভৈরবীর চলে যাওয়াও তেমনই এক নির্মম বিদায়। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, ‘জীবনের সুখ আসলে ছোট ছোট মুহূর্ত দিয়ে তৈরি করা হয়।’ কথাগুলোতে ছিল জীবনের প্রতি এক গভীর উপলব্ধি, ছিল ছোট ছোট আনন্দকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার দর্শন। কে জানত, এই লেখাটিই হয়ে থাকবে তার জীবনের শেষ কথাগুলোর একটি। পোস্টটি দেওয়ার মাত্র ১৩ ঘণ্টা পরই সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে যায় তার জীবন। থেমে যায় একটি কণ্ঠ, থেমে যায় এক তরুণ শিল্পীর স্বপ্নের পথচলা।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতেও পেহেলি ছিলেন মঞ্চে। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার বৈরাগী বাজারে হযরত ছাবাল শাহ (রহ.)-এর মাজারে বসেছিল গানের আসর। লালনগীতি, বিচ্ছেদ গান আর একতারার সুরে রাতের পরিবেশকে অন্যরকম করে তুলেছিলেন তিনি। সামনে বসা দর্শকদের কেউ হয়তো মুগ্ধ হয়ে তার গানের ভিডিও ধারণ করছিলেন, কেউ হয়তো চুপচাপ শুনছিলেন তার কণ্ঠের মায়া। পেহেলিও হয়তো ভাবছিলেন, আরও অনেকবার এমন মঞ্চে উঠবেন, আরও অনেক গান গাইবেন, আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাবেন। গান শেষে যখন বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন, সেটি যে তার জীবনের শেষ যাত্রা হতে যাচ্ছে, তা জানতেন না তিনি, জানতেন না পাশে থাকা মানুষগুলোও।
তারপর আসে সেই সকাল। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের। মুহূর্তের একটি দুর্ঘটনা ছিন্নভিন্ন করে দেয় একাধিক পরিবারের স্বপ্ন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান পেহেলি। আগের রাতে যে তরুণী গানের আসরে প্রাণের উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছিলেন, পরদিন সেই তিনিই পড়ে রইলেন নিথর। মাত্র ১৯ বছর বয়সে একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তার বর্তমান, ভবিষ্যৎ এবং শিল্পী হয়ে ওঠার অসংখ্য সম্ভাবনা। তার জীবনের গল্প যেখানে আরও দীর্ঘ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে হঠাৎই টেনে দেওয়া হলো শেষ লাইনটি।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার চন্ডিবের এলাকার বাবুল মিয়ার মেয়ে পেহেলির জীবনে গান এসেছিল ভালোবাসা হয়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকসংগীত ও লালনগীতির প্রতি তার টান আরও গভীর হয়। মিষ্টি কণ্ঠ, সহজাত গায়কী আর নিজের মতো করে গানকে ধারণ করার ক্ষমতা তাকে ধীরে ধীরে পরিচিত করে তুলছিল। তার সামনে ছিল শিল্পী হিসেবে নিজেকে আরও পরিণত করার সময়। ছিল নতুন গান, নতুন মঞ্চ, নতুন শ্রোতা আর আরও দূরে যাওয়ার স্বপ্ন। যারা কাছ থেকে তার গান শুনেছেন, তারা জানেন, পেহেলির গল্পটি কেবল ১৯ বছরের একটি তরুণীর গল্প ছিল না; এটি ছিল সম্ভাবনাময় একজন শিল্পীর বেড়ে ওঠার গল্প। কিন্তু সেই বেড়ে ওঠার আগেই জীবন তাকে থামিয়ে দিল।
অদ্ভুতভাবে, মৃত্যুর আগের কয়েক ঘণ্টাতেও পেহেলি নিজের স্বপ্নের খুব কাছেই ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈরাগী বাজারের অনুষ্ঠানে দর্শকদের আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি। নিজের গান, নিজের মঞ্চ এবং শ্রোতাদের নিয়েই ছিল তার ব্যস্ততা। সেই পোস্টের নিচে হয়তো কেউ লিখেছিল, ‘আসব’, কেউ হয়তো ভালোবাসা জানিয়েছিল। কেউ জানত না, এই আমন্ত্রণের পর আর কোনোদিন পেহেলি নতুন কোনো অনুষ্ঠানের ডাক দেবেন না। সেদিন রাতের গানের আসরটিও তাই এখন অন্য অর্থ বহন করছে। সেটি শুধু তার জীবনের শেষ অনুষ্ঠান নয়, তার শিল্পীজীবনেরও শেষ অধ্যায়। আগের রাতে যে একতারা বেজেছিল, যে কণ্ঠে বিচ্ছেদের গান উঠেছিল, সেই সুর আর কোনো নতুন ভোরে ফিরে আসবে না।
পেহেলির শেষ ফেসবুক পোস্টটিও এখন যেন আরও গভীর অর্থ নিয়ে ফিরে আসছে। ‘জীবনের সুখ আসলে ছোট ছোট মুহূর্ত দিয়ে তৈরি করা হয়।’ তিনি হয়তো জানতেন না, একদিন তার নিজের জীবনটাও মানুষের কাছে ছোট ছোট স্মৃতির সমষ্টি হয়ে থাকবে। কোনো শ্রোতার মনে থাকবে তার গাওয়া একটি গান, কারও মোবাইলে হয়তো রয়ে যাবে তার কোনো ভিডিও, পরিবারের কাছে থাকবে তার হাসি, সহশিল্পীদের মনে থাকবে মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার স্মৃতি। অথচ এসবের মধ্যেই সবচেয়ে কষ্টের সত্যিটা হলো, পেহেলির সামনে যে দীর্ঘ জীবন থাকার কথা ছিল, সেটিই আর হলো না। একটি শিল্পীর কণ্ঠ পরিণত হওয়ার আগেই নীরব হয়ে গেল, একটি স্বপ্ন পূর্ণতা পাওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল তার পথচলা।
পেহেলির মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, এটি একটি অপূর্ণ সম্ভাবনারও মৃত্যু। ১৯ বছর বয়সে মানুষ সাধারণত জীবনের শুরুটুকু পেরিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে শেখে। পেহেলিও তাকিয়েছিলেন। তার ছিল গান, ছিল স্বপ্ন, ছিল মঞ্চে দাঁড়িয়ে আরও অনেক কিছু বলার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তাকে সেই সুযোগটুকুও দিল না। এখন তার কণ্ঠ শোনা যাবে রেকর্ডে, ভিডিওতে, স্মৃতিতে। আর তার শেষ পোস্টটি হয়তো বারবার মনে করিয়ে দেবে, জীবন সত্যিই ছোট ছোট মুহূর্ত দিয়ে তৈরি। শুধু পেহেলির ক্ষেত্রে সেই মুহূর্তগুলোর সংখ্যা বড় হওয়ার আগেই জীবন থেমে গেছে। তার সুর থেমেছে, কিন্তু যারা একবার সেই সুর শুনেছেন, তাদের স্মৃতিতে হয়তো বহুদিন ধরে বেঁচে থাকবে ১৯ বছরের সেই তরুণী শিল্পী, পেহেলি ভৈরবী।
মতামত দিন