কুমিল্লায় এক রাতেই ৬২৪ আটক, পুলিশের অভিযানে যা সামনে এলো
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এক রাতের অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে চালানো সাঁড়াশি অভিযানের পর বৃহস্পতিবার পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৫১ জন কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১৭৩ জনকে মাদকসেবন, নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্ট, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসংক্রান্ত মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর জেলায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের একটি জঙ্গল থেকে সপ্তম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততার সন্দেহে আটক করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে কিশোর অপরাধ ও সংঘবদ্ধ কিশোর চক্রের বিষয়টি সামনে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক বছরে কুমিল্লায় ছিনতাই, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কিশোর গ্যাংয়ের পরিচয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া কিংবা ছিনতাইয়ের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বুধবার রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালায় পুলিশ। কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ে সম্পৃক্ততার অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী বলে জানান তিনি। তাদের মধ্যে মাদকসেবী এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আসামিও ছিলেন।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, কাউকে হয়রানি করা অভিযানের উদ্দেশ্য নয়। কিশোর বয়সী অপরাধীদের একটি কড়া বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বা মাদকসহ আটক করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদের মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সন্ধ্যার পর বখাটেদের উৎপাত বাড়ছে—এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেও অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানান লুৎফর রহমান। কিশোর অপরাধ কমাতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে অভিযানের মধ্যেই দাউদকান্দি মডেল থানায় আটক ১৭ কিশোর কক্ষের দরজা ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ জানায়, একসঙ্গে অনেককে আটক করায় থানায় সাধারণ মানুষের ভিড় তৈরি হয়েছিল। এ সময় হট্টগোলের সুযোগে তারা পালিয়ে যায়। পরে তাদের আবার আটক করা হয়।
কুমিল্লার এই অভিযানের মধ্য দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে পুরোনো আলোচনাও সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। কিশোরদের মাদক, সংঘাত, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও গত কয়েক বছরে নিয়মিত সামনে এসেছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক সামাজিক কারণ কাজ করছে। মাদকের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক মূল্যবোধের দুর্বলতা, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারকে তারা এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধের পেছনে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে তৈরি হওয়া ‘বড়ভাই’ সংস্কৃতি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের ভূমিকার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কিশোরদের আটক বা শাস্তির আওতায় আনলে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না; যারা তাদের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করছে, তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও সংঘবদ্ধ কিশোর অপরাধ চক্রের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
মতামত দিন