বাংলাদেশে ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন, বাড়তে পারে দারিদ্র্য: বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব থেকে দূরে নেই বাংলাদেশ। জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা, গ্যাস সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সারের দাম বাড়ার কারণে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের আয়-রোজগার ও জীবনযাত্রায়। সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল—এমন মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের এক মূল্যায়নে এসব আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই মূল্যায়ন করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি তেল, সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির বাড়তি ব্যয় মেটাতে বিশ্বব্যাংকের কাছে বাজেট সহায়তা চেয়েছিল সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ জুন একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে বিশ্বব্যাংক। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি, জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি এবং এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়।
দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরুর পর বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাংকের কাছে সহায়তা চায় সরকার। বিশ্বব্যাংক এ সহায়তা দিতে সম্মত হয়। তবে সংস্থাটি শর্ত দেয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অব্যবহৃত পড়ে থাকা অর্থ একত্র করে তার সঙ্গে বাজেট সহায়তা সমন্বয় করা হবে। এসব অর্থ আগেই বাংলাদেশের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
এর ধারাবাহিকতায় গত ২৬ জুন বাংলাদেশকে ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বাজেট সহায়তা অনুমোদন করে বিশ্বব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলা এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দারিদ্র্য কমার গতি থমকে যেতে পারে
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয় কম বাড়ার কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে সেভাবে পৌঁছায়নি।
চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির বাড়তি দাম গ্রাহকদের ওপর আংশিকভাবে চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু তেল বা গ্যাসের খরচই বাড়বে না, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাবারসহ অন্যান্য পণ্যের দামেও পড়বে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন নিম্নআয়ের ও দরিদ্র মানুষ।
জ্বালানি সংকটে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদনে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে, দেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশ সরাসরি এর প্রভাবের মুখে পড়ে।
সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার ছয়টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এসব চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউতে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সরবরাহ সংকটের মধ্যেই সেপ্টেম্বরের জন্য দুটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি এমএমবিটিইউতে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে।
সরকার এখন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা বাড়ানোর পথ খুঁজছে।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এ সংকট একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। আগের সময় থেকে পাওয়া সমস্যাগুলো রাতারাতি ঠিক করা যাবে না, এর জন্য সময় লাগবে।
ভর্তুকির চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর
জ্বালানির দাম বাড়ায় সরকারের ওপরও আর্থিক চাপ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে সরকারের মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২৫০ কোটি থেকে ৪৮০ কোটি ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলার।
বাড়তি ভর্তুকির অর্থ জোগাতে সরকারকে অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হতে পারে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা ও জরুরি প্রয়োজনের খাতে সরকারি ব্যয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
সার উৎপাদনেও ধাক্কা
জ্বালানি সংকটের বড় প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সারসহ কৃষির বিভিন্ন উপকরণের সরবরাহে সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছোট কৃষকদের।
বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের সরবরাহ ও দামে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে দেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন দ্রুত চাপে পড়ে।
দেশে সার উৎপাদনের জন্যও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। এরই মধ্যে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিকে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।
এর পাশাপাশি ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে বাংলাদেশে খাদ্যের দাম বাড়িয়েছিল। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সার ভর্তুকিতে সরকারের ব্যয়ও বেড়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতেও একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
স্বাস্থ্য খাতেও বাড়ছে খরচ
জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য খাতেও। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি খরচের কারণে দেশের প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক চাপে পড়েছে।
দেশের প্রায় ৬৪টি বড় সরকারি হাসপাতালের বিদ্যুৎ বিলেই মাসে প্রায় ৬ থেকে ১১ লাখ ডলার খরচ হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে তাদের জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়ে।
ওষুধ শিল্পও এই সংকটের বাইরে নয়। দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আমদানি করে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হলে এসব কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়ে।
এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত ৯০ শতাংশের বেশি সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়। ফলে জাহাজভাড়া ও জ্বালানির দাম বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার খরচও বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাড়তি এই খরচ এমন সময়ে স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ তৈরি করছে, যখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমনিতেই নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে।
মতামত দিন