এপ্রিলে ৯৮টি রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৬, আহত ৫৩৩
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সারা দেশে ৯৮টি রাজনৈতিক সহিংসতায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্দ্বন্দ্বে ৬ জন নিহত এবং ৫৩৩ জনের বেশি বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা মার্চ মাসের তুলনায় কমেছে। গত মার্চে ১১৩টি সহিংসতার ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৯১২ জন আহত হয়েছিলেন।
মঙ্গলবার (৫ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। দেশের জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনের নিজস্বভাবে সংগৃহীত তথ্য ও তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এপ্রিল মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা
প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিলে ৯৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ৪০টি ঘটনায় কমপক্ষে ২৪৭ জন আহত ও চারজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ১২টি ঘটনায় আহত ১১৩ জন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ১৩টি ঘটনায় আহত ৫৮ জন, বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষের ৩টি ঘটনায় আহত ২৬ জন এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের সংঘর্ষের ২১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৬ জন। জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্বের ১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২০ জন এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে ৬টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩ জন। এছাড়া ২টি ঘটনায় ইউপিডিএফের দুজন সদস্য নিহত হয়েছেন।
দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজি
আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং দেশজুড়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। দুষ্কৃতকারীদের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের ওপর অন্তত ১৩টি হামলায় কমপক্ষে ৩২ জন আহত ও ৬ জন নিহত হয়েছেন— যাদের মধ্যে বিএনপির ৩ জন, আওয়ামী লীগের ২ জন ও জামায়াতের ১ জন। এ সময়ে ৩৭ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখল ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক ২৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ৬৭টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তার
এপ্রিলে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের নামে ২৩টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৮৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১,২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। রাজনৈতিক মামলায় বিভিন্ন দলের কমপক্ষে ২৮২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে— যার মধ্যে আওয়ামী লীগের কমপক্ষে ১৭৪ জন, বিএনপির ৮৪ জন ও জামায়াতের ১৯ জন। এছাড়া যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ১,০৮৯ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতা
গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৪৪টি ঘটনায় কমপক্ষে ২২ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন।
সাংবাদিক নির্যাতন
এপ্রিলে ৪০টি হামলার ঘটনায় ৭৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে কমপক্ষে ৪২ জন আহত, ১৭ জন লাঞ্ছনার শিকার এবং ১০ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। ৩ জন সাংবাদিককে আটক ও ৪টি মামলায় ৫ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ
এপ্রিলে ৭টি সভা ও সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে, এতে ৪৯ জনের বেশি আহত ও ২ জন আটক হয়েছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্তত ১৪টি ঘটনায় ২৩ জনকে আটক ও ৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় ১ জন, বিএনপি নেতাকর্মীদের সমালোচনায় ৫ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ৫ জন এবং অন্যান্য কারণে ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর অধীনে ৭টি পৃথক মামলায় ১৮ জনকে অভিযুক্ত ও আটক করা হয়েছে।
কারাগারে মৃত্যু
সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৫ জন মারা গেছেন— যার মধ্যে ২ জন কয়েদি ও ৩ জন হাজতি। এদের মধ্যে একজন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং বাকি চারজন সাধারণ কয়েদি ও হাজতি।ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলাএ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৮টি হামলায় ১৩ জন আহত হয়েছেন। ৩টি মন্দির, ২টি প্রতিমা ও একটি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কুষ্টিয়ায় একটি মাজারে হামলায় পীর শামীম নিহত ও ১০ জন অনুসারী আহত হয়েছেন।
সীমান্তে হতাহত ও আটক
এপ্রিলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮টি হামলায় ১ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং বিএসএফ ৮ জনকে আটক করেছে। সিলেট সীমান্তে ভারতীয় নাগরিক খাসিয়াদের গুলিতে ২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২টি সহিংসতার ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে এবং আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইনে ২ জন রোহিঙ্গার পা গুরুতর জখম হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতন
এপ্রিলে ৮০টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ১১৬ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় আরও ৬৪ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া রাজধানীর বনানী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৃথক দুটি ঘটনায় দুজন গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন
এপ্রিলে ২৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৬৮ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ৩০ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪০ জন শিশু। যৌতুকের জন্য নির্যাতনে ৮ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতায় ৬৪ জন নিহত, ৩৬ জন আহত এবং ৩৬ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। এসিড নিক্ষেপে ১ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ১৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন ও ১৩৪ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে