ঈদের সাত দিনের ছুটিতে হামে ৫৭ শিশুর মৃত্যু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
ঈদুল আজহার দীর্ঘ সাত দিনের ছুটিতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৫৭ শিশু। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি বা চিকিৎসা নিয়েছে সাত হাজার ১২৭ জন। ফলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবারকে শিশুদের চিকিৎসার কারণে হাসপাতালেই ঈদ উদ্যাপন করতে হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এক হাজার ৩২৪ জন চিকিৎসা নিয়েছে, ৭৯১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ৫৩ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এখনও হামের সংক্রমণ উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং মৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনক।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দেশে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে পরিস্থিতির তথ্য প্রকাশ করছে। অধিদপ্তরের হিসাবে, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৭০ হাজার ৯৩৬ জন। তাদের মধ্যে ৫৬ হাজার ৮৮৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৯ হাজার ৪৯ জনের। গত ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত হাম ও হামের জটিলতায় ৫৮৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৪৯ জনের বেশি শিশুর প্রাণ গেছে। সর্বশেষ ১২তম সপ্তাহে (২৫-৩১ মে) মারা গেছে ৫৭ শিশু এবং আক্রান্ত হয়েছে সাত হাজার ১২৭ জন।
এদিকে, হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় রাজধানীর মহাখালী ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল এবং ইনস্টিটিউটে দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। রোগীর স্বজনেরও ভিজিটর কার্ড দেখিয়ে ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রোগীদের সুরক্ষার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদেরও হাম ইউনিটে প্রবেশের আগে বিশেষ অনুমতি নিতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহাখালী ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ‘বাইরে থেকে অনেক মানুষ হাম ওয়ার্ডে ভিড় করছেন। সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে প্রবেশে কড়াকড়ি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।’
রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ‘দেশে হামের সংক্রমণ এখনও ঊর্ধ্বমুখী। তবে যেসব শিশু টিকা নিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা ও জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। ঢাকার বাইরে থেকে অনেক রোগী সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসে। ফলে ভর্তি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। অপুষ্টি এ ক্ষেত্রে বড় একটি কারণ। সুপুষ্ট শিশুরা আক্রান্ত হলেও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে হামের সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো নিউমোনিয়া। এবারের নিউমোনিয়া অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে এবং রোগীদের ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। হামের জ্বর বা র্যাশ চলে যাওয়ার পর অনেকেই মনে করেন শিশু সুস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু পরবর্তী চার থেকে ছয় সপ্তাহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম থাকে। এ সময় শিশুকে আলাদা রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো জরুরি।’

মতামত দিন