দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে ৩৮ শিশুর মৃত্যু
দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে শুধু চলতি মার্চ মাসেই মারা গেছে ৩২ শিশু। এদিকে রাজশাহীতে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সাসপেক্টেড আরও দুই শিশুর মৃত্যু হওয়ায় পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ জন এবং রাজশাহী ও পাবনায় ১ জন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন জেলা ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য যোগ করলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মহাখালীর ১০০ শয্যার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এ বছর ৫৬০ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছে, যেখানে গত বছর পুরো সময়ে ছিল মাত্র ৬৯ জন। হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট তানজিনা জাহান জানান, চলতি মাসের প্রথম ২৯ দিনেই ৪৪৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সাসপেক্টেড দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সেখানে সাসপেক্টেড হামে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৩ জনে। বর্তমানে হাসপাতালে ৯৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছে এবং নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৬ জন। রোগীদের জন্য একটি পৃথক আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও হামের উপসর্গ নিয়ে ছয় মাসের কম বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজার থেকে আনা শিশুটি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে মারা যায়। নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাতই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন্নেসা বলেন, প্রথম ডোজের হার ভালো হলেও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা রয়েছে। টিকা না নেওয়া ছোট ছোট গোষ্ঠী থেকেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ইপিআই পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, প্রতি চার বছর অন্তর বিশেষ হাম টিকা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ সালে তা সম্ভব হয়নি। এছাড়া গত বছর স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি কয়েক দফা ব্যাহত হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে হামসহ ১০ ধরনের জীবনরক্ষাকারী টিকার সংকট দেখা দিয়েছে। তবে সংকট কাটাতে ইতোমধ্যে ইউনিসেফকে ৬০৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। দ্রুত টিকা দেশে পৌঁছে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হবে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেসব হটস্পট চিহ্নিত করে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা জোরদারে বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয়ও করা হচ্ছে।
এদিকে রামেক হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভের পর মঙ্গলবার হাসপাতালের আইসিইউতে নতুন ৩টি ভেন্টিলেটর হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত ২০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। শিশুদের দ্রুত টিকাদান, ভিটামিন-এ সেবন ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে