স্কুলছাত্র নাশিত হত্যা: ফেনীতে ছাত্রদল কর্মীসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
ফেনীতে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ আল মাঈন নাশিতকে (১০) অপহরণ ও হত্যার দায়ে ফেনী পৌর ছাত্রদলের এক কর্মীসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন আশরাফ হোসেন তুষার (২২), মোবারক হোসেন ওয়াসিম (২২) ও ওমর ফারুক রিফাত (২২)। আশরাফ হোসেন তুষার ফেনী পৌর ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের সহপ্রচার সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জিয়া স্মৃতি সংসদের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) এ এন এম মোর্শেদ খান এ রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে কারাগারে আটক তিন আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এজলাসে নেওয়ার সময় তারা সাংবাদিকদের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। রায় ঘোষণার পর আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ফেনী শহরের একাডেমি এলাকার আতিকুল আলম সড়কে কোচিং শেষে স্থানীয় বায়তুল খায়ের জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যায় নাশিত। নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে পূর্বপরিচিত তুষার ও তার সহযোগীরা তাকে অপহরণ করে শহরতলির দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে জুসের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে নাশিতকে অচেতন করা হয়। পরে তার ছবি তুলে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। একপর্যায়ে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ রেললাইনের পাশে ফেলে দেওয়া হয়। মরদেহ পানিতে ভেসে না ওঠার জন্য স্কুলব্যাগে পাথর ভরে চাপা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর ৯ ডিসেম্বর নাশিতের বাবা মাঈন উদ্দিন সোহাগ ফেনী মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। পরবর্তী দুই দিন একটি নম্বর থেকে ফোন করে তার কাছে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। সন্দেহভাজন হিসেবে তুষারের নাম পুলিশকে জানালে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়ানগঞ্জ এলাকার একটি ডোবা থেকে নাশিতের স্কুলব্যাগসহ মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরে পুলিশ প্রধান অভিযুক্ত তুষারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। দণ্ডপ্রাপ্ত মোবারক হোসেন ওয়াসিম ফেনী পৌরসভার বারাহিপুর এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। ওমর ফারুক রিফাত লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার কামালপুর এলাকার বাসিন্দা।
২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করা হয়।
রায় ঘোষণার পর নাশিতের বাবা মাঈন উদ্দিন সোহাগ বলেন, তার স্কুলপড়ুয়া সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই রায়ে তিনি সন্তুষ্ট এবং দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের পিপি মো. শাহাব উদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলাটির বিচার সম্পন্ন হয়েছে। মামলায় ২২ জন সাক্ষীর সবাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। দ্রুত এই রায় ঘোষিত হওয়ায় এটি আইনের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে