এশিয়ার সেরা বিজ্ঞানীদের তালিকায় ৩ বাংলাদেশি
গবেষণাক্ষেত্রে অনন্য, যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী ‘এশিয়ান সায়েন্টিস্ট’ প্রকাশিত এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের তিনজন কৃতী গবেষক। এই অর্জন দেশের গবেষণা অঙ্গনের জন্য এক বিরল সম্মান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠিত এই তালিকায় স্থান পাওয়া গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিরলস গবেষণা, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে অবদান রেখে আসছেন। তাদের গবেষণা কাজ শুধু একাডেমিক পরিমণ্ডলেই নয়, বরং বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক এই বিজ্ঞানভিত্তিক স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গবেষণা খাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও একধাপ এগিয়ে গেল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিজ্ঞানীরা আশা প্রকাশ করেছেন, এই ধরনের স্বীকৃতি ভবিষ্যতে দেশের তরুণ গবেষকদের আরও উৎসাহিত করবে এবং বৈশ্বিক গবেষণা অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।
আন্তর্জাতিক এই তালিকায় স্থান পাওয়া বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা হলেন তরুণ গবেষক মারজানা আক্তার, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের ‘আইসিডিডিআর,বি’ নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বুটেক্স’ সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়ক। বিজ্ঞান সাময়িকীটির এই আন্তর্জাতিক তালিকায় স্থান পাওয়া গবেষকদের বিশেষ অনারি বা সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
এই আন্তর্জাতিক তালিকায় এশিয়ার গবেষকদের স্থান পাওয়ার জন্য সাধারণত পূর্ববর্তী বছরে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো বৈজ্ঞানিক সাফল্য, গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার, মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন অথবা একাডেমিয়া ও শিল্প খাতে ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব প্রদর্শনের প্রমাণ থাকতে হয়। এসব মানদণ্ডের ভিত্তিতেই সেরা বিজ্ঞানীদের বাছাই করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চলতি বছরের প্রকাশিত তালিকায় আরও স্থান পেয়েছেন বিশ্বের খ্যাতনামা একাধিক বিজ্ঞানীও। এর মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী শিমন সাকাগুচি, রসায়নে নোবেলজয়ী সুসুমু কিতাগাওয়া, পাশাপাশি গণিতের ক্ষেত্রে মর্যাদাপূর্ণ আবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রখ্যাত গণিতবিদ মাসাকি কাশিওয়ারা। তাদের অন্তর্ভুক্তি এই তালিকাটিকে আরও সমৃদ্ধ ও বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন করে তুলেছে।
বাংলাদেশের তরুণ গবেষক মারজানা আক্তার
আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী ‘এশিয়ান সায়েন্টিস্ট’ প্রকাশিত চলতি বছরের এই তালিকার সবচেয়ে কম বয়সী বিজ্ঞানী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন বাংলাদেশের তরুণ গবেষক মারজানা আক্তার। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই কৃতি শিক্ষার্থী মূলত কৃষিবিজ্ঞান বিভাগে এই অসামান্য গৌরব অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশের পোলট্রি খাতে প্রথমবারের মতো একটি বিশেষ ভাইরাস শনাক্ত করে দেশের ভাইরোলজি গবেষণায় সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করেন। এর আগে তিনি বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে মাত্র ১০ জন নির্বাচিত তরুণীর একজন হিসেবে ২০২৫ সালে জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ ‘ইয়াং উইমেন ফর বায়োসিকিউরিটি ফেলোশিপ’ লাভ করেন, যার মাধ্যমে তিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বায়োসিকিউরিটি, বায়োসেফটি এবং সায়েন্স ডিপ্লোম্যাসি নিয়ে কাজ করছেন।
তরুণ বিজ্ঞানী মারজানার এই অনন্য অর্জনের বিষয়ে তার স্বামী এবং নিউজিল্যান্ডভিত্তিক ওয়্যারলেস পাওয়ার ট্রান্সফার কোম্পানির সহপ্রতিষ্ঠাতা ইউশা আরাফ জানান, মারজানার এই গবেষণার পথচলা সহজ ছিল না। মাস্টার্সে ভর্তির পর গর্ভাবস্থায় ল্যাব ও থিসিসের কাজ করার সময় নানা শারীরিক জটিলতায় তাকে আইসিইউতেও থাকতে হয়েছিল। তবে সমস্ত বাধা জয় করে সন্তান জন্মের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি তার মাস্টার্স থিসিস সফলভাবে ডিফেন্ড করেন।
আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশি গবেষক ড. তাহমিদ আহমেদ
আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃত এই তালিকায় জায়গা পাওয়া দ্বিতীয় বাংলাদেশি গবেষক ড. তাহমিদ আহমেদ বর্তমানে আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষ করে মা ও শিশুর পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ এবং ডায়রিয়া প্রতিরোধে যুগান্তকারী ও আন্তর্জাতিক মানের অবদান রাখছেন।
তাহমীদ আহমেদ একজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী, যার গবেষণার মূল বিষয় হলো গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি , জনস্বাস্থ্য পুষ্টি এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য । তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক এবং কলেরা ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি মাতৃ ও শিশু অপুষ্টিতে বিশেষজ্ঞ। তিনি ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ থেকে আন্তর্জাতিক ডায়রিয়া রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)- এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এই পদে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম বাংলাদেশী।
ডঃ আহমেদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি . গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এ জনস্বাস্থ্য পুষ্টির অধ্যাপক হিসেবেও কর্মরত আছেন। তিনি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল হেলথ বিভাগে একজন অ্যাফিলিয়েট অধ্যাপক। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের পুষ্টি নীতির খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বুটেক্স’ সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়ক
তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে তালিকায় স্থান পাওয়া ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়ক বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়স অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু এই বিশাল শিল্পের একটি নেতিবাচক দিক হলো পরিবেশ দূষণ। এই দূষণ কমিয়ে পোশাক শিল্পকে কিভাবে পরিবেশবান্ধব করা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়ক।
মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন উদ্ভাবন প্রতিযোগিতা ‘গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’-এ বিশ্বের সেরা ১০ উদ্ভাবকের একজন নির্বাচিত হয়েছিলেন ড. আব্বাস উদ্দিন। গত বছরের ২০ মে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ওল্ড বেল-এ আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তার যুগান্তকারী আইডিয়া ‘ডিকার্বনাইজেশন ল্যাব’ এর জন্য তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল।
তার উদ্ভাবনী প্রকল্প ‘ডিকার্বনাইজেশন ল্যাব ফর টেক্সটাইল প্রসেস ইনোভেশন’-এর মাধ্যমে টেক্সটাইল কারখানায় এমন একটি ডাইং ও ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা যাবে, যা পোশাক শিল্পে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনবে। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির কারণে পরিবেশে যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, সেটি মোকাবেলায় এই উদ্ভাবন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই অর্জনের সূত্র ধরেই এবার এশিয়ার সেরা বিজ্ঞানীদের কাতারে তার নাম উঠে এসেছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে