Views Bangladesh Logo

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২৮ বছর আজ

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

জ ২ ডিসেম্বর, ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২৮তম বার্ষিকী। ১৯৯৭ সালের এই দিনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পাহাড়ে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর সঙ্গে এ চুক্তি স্বাক্ষর করে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। তবে জমি-সংক্রান্ত বিরোধসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে উত্তেজনা, অবিশ্বাস ও সংঘাত এখনো রয়ে গেছে। একই সঙ্গে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু ধারা বাতিল বা সাংবিধানিকভাবে পুনর্বিবেচনার দাবিও উঠছে।

চুক্তির পর পাহাড় থেকে সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীর ২৫০টির বেশি ক্যাম্প তুলে নেওয়া হয়। তবে এর পরবর্তী সময়ে ছয়টি নতুন সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে ওঠে, যারা চাঁদাবাজি, অপহরণ ও খুনসহ নানা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত। এসব গ্রুপের পারস্পরিক দ্বন্দ্বও আরও তীব্র হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন পাহাড়ি জেলার প্রায় ১৩ হাজার বর্গমাইল অনিরাপদ সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র পাচার ও ভারতের দিক থেকে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তাই সেনা ক্যাম্প পুনঃস্থাপন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

এদিকে সরকার, জনসংহতি সমিতি এবং স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে মতবিরোধ এখনো কাটেনি। প্রায় তিন দশক পরও পরস্পরের অভিযোগ-প্রত্যাশা একই রয়ে গেছে।

বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে জনসংহতি সমিতি বলেছে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাঁচটি রাজনৈতিক সরকার এবং দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলেও কেউ রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখায়নি। ফলে দুই-তৃতীয়াংশ ধারা—যার মধ্যে মূল বিষয়গুলোও রয়েছে—আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

অব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর মধ্যে রয়েছে-পাহাড়ি অঞ্চলকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা প্রদান, আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন জেলা পরিষদের কাছে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর, ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও পরিষদ নির্বাচন, স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে পাহাড়ি পুলিশ গঠনি এবং জমি কমিশনের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি ও বাস্তুচ্যুত জুম্মদের জমি ফেরত দেওয়া।

বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে এবং জমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগ বিচারপতি মুহাম্মদ আব্দুল হাফিজকে নিয়োগ দিলেও পাঁচ মাসে মাত্র একবার বৈঠক হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ইন্তুমণি তালুকদার বলেন, পাহাড়ের মূল সমস্যা জমি। এক লাখের বেশি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ ও ভারত ফেরত শরণার্থী এখনো জমি ফিরে না পেয়ে নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।

জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ও সাবেক সাংসদ উষাতন তালুকদার বলেন, আগামী নির্বাচিত সরকারকে আন্তরিকতা নিয়ে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।

সোমবার পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ সংবাদ সম্মেলনে বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনা, পাহাড়ের সব বাসিন্দার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-জমি অধিকার নিশ্চিত করা, সব সশস্ত্র গ্রুপ নির্মূল করা, অবৈধ অস্ত্র জব্দ এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তুলে নেওয়া সব নিরাপত্তা ক্যাম্প পুনঃস্থাপন।

অন্যদিকে, জাতীয় প্রেস ক্লাবে আরেক সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন তিনটি দাবি তোলে— নির্বাচনী ইশতেহারে চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংলাপ আয়োজন এবং দৃশ্যমান কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, বাঙালি বসতি স্থাপনকারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং জমি বিরোধই শান্তির প্রধান প্রতিবন্ধকতা। এর সঙ্গে পাহাড়ি গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং নতুন সশস্ত্র সংগঠনের উত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষজ্ঞদের মত, স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে জমি কমিশন সক্রিয় করা, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বাড়ানো এবং সব পক্ষের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের বিকল্প নেই।



মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ