Views Bangladesh Logo

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ২৬.৬৪ শতাংশের কোনো সঞ্চয় নেই: আইএনএমের জরিপ

দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপের সঙ্গে মানুষের আয় তাল মেলাতে না পারায় দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ সঞ্চয় করতে পারছে না। এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকার ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো ধরনের সঞ্চয় নেই। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর তাদের হাতে ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমিয়ে রাখার মতো সামর্থ্য থাকছে না।

দেশের গ্রামীণ মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে জরিপ পরিচালনা করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কম্প্রিহেনসিভ রুরাল ফাইন্যান্স স্টাডি’ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৩৮টি জেলার সাত হাজারের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে জরিপটি করা হয়েছে। এতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় পরিস্থিতির একটি চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর পর তাদের হাতে সঞ্চয়ের মতো বাড়তি অর্থ থাকে না। এ ছাড়া ৩২ শতাংশ মানুষ অনিয়মিত আয়, ২২ শতাংশ অপর্যাপ্ত আয় এবং ১৫ শতাংশ দায়-দেনা পরিশোধকে সঞ্চয়ের পথে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে রংপুর। এ বিভাগের ৪৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের কোনো সঞ্চয় নেই। সঞ্চয়ের ধরনেও সেখানে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার তুলনায় ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ওপর নির্ভরতা বেশি। রংপুরে মাত্র ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রাখেন। বিপরীতে ৪১ দশমিক ৫৬ শতাংশ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠান বা এনজিওতে সঞ্চয় করেন।

রংপুরের পর সঞ্চয়হীনতার হার সবচেয়ে বেশি সিলেটে, ৩৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। চট্টগ্রামে এ হার ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ঢাকায় ২৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, খুলনায় ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ময়মনসিংহে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং বরিশালে ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

সঞ্চয় করতে না পারার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। আয় বাড়লেও দ্রব্যমূল্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ দ্রুত বাড়ায় পরিবারের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত টানা পাঁচ অর্থবছর গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম ছিল। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১১ শতাংশ। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি ছিল দশমিক ৫৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

ফলে আয় কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না। বরং অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কিংবা আগের সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, মূল্যস্ফীতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সীমিত বৈচিত্র্য এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। গত কয়েক বছরে অর্থনীতি নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, অন্যদিকে সেই অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতিও প্রত্যাশিত মাত্রায় ছিল না।

তিনি মনে করেন, অনেক পরিবারকে সংসারের খরচ মেটাতে আগের সঞ্চয়ও ভাঙতে হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সঞ্চয়হীনতার প্রভাব শুধু বর্তমান ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হঠাৎ অসুস্থতা, কাজ হারানো, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে পরিবারের হাতে নিজস্ব অর্থ না থাকলে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরবর্তী সময়ে পরিবারের ওপর আরও বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

একই কারণে সন্তানদের শিক্ষা, বাড়ি নির্মাণ কিংবা অবসরের প্রস্তুতির মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হয়।

জরিপ পরিচালনা দলের সদস্য ও গবেষণা ফেলো ড. ফারহানা নার্গিস বলেন, গ্রামীণ পরিবারগুলো সঞ্চয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে জানলেও আনুষ্ঠানিক সঞ্চয় ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আর্থিক সচেতনতার ঘাটতি, অনিয়মিত আয় এবং প্রচলিত অনানুষ্ঠানিক সঞ্চয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা এ সমস্যাকে জটিল করছে।

তার মতে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে গ্রামভিত্তিক আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচি চালানো যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রান্তিক ও অনগ্রসর এলাকায় ব্যাংকের শাখা ও উপশাখা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। মানুষের আয় স্থিতিশীল ও পর্যাপ্ত না হলে নিয়মিত সঞ্চয় করা কঠিন। তাই গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।

কৃষির পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং অন্যান্য অকৃষি খাতের প্রসার ঘটানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তরুণদের কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে আয়ের উৎসও বাড়বে।

গ্রামীণ পরিবারের সঞ্চয় কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে খাদ্য ব্যয়ের চাপও বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবারের পেছনে ব্যয় করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত বছরের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকার ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার তাদের আয়ের ৬৫ শতাংশ বা তারও বেশি খাদ্য কিনতে ব্যয় করে।

ফলে আয়ের বড় অংশ খাবারসহ মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে চলে যাওয়ায় সঞ্চয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশের সঞ্চয় না থাকার চিত্রটি কেবল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের ঘাটতি নয়, বরং আয়, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের গভীর সংকটের প্রতিফলন। মানুষের আয় যদি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে এবং পরিবারের আয়ের বড় অংশ মৌলিক ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে সঞ্চয় বাড়ানো কঠিন হবে।

তাই গ্রামীণ মানুষের সঞ্চয় বাড়াতে আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক সচেতনতা এবং সহজলভ্য আর্থিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ