জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা
বিষাক্ত বুড়িগঙ্গায় টিকে আছে ২০ ডলফিন, গভীর পানিতে খুঁজছে নিরাপদ আশ্রয়
বুড়িগঙ্গা নদীর বিষাক্ত, তেলের আস্তরণ পড়া কালচে পানি, যেখানে সাধারণ জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, সেখানে গভীর পানির আড়ালে নিঃশব্দ বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালাচ্ছে ‘গাঙ্গেয় নদীর ডলফিন’ বা স্থানীয় নদীর শুশুক। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, চরম প্রতিকূল পরিবেশে এই প্রাণীররা প্রাণ বাঁচানোর শেষ মরিয়া চেষ্টা হিসেবে নতুন কৌশল নিয়েছে। তারা এখন তাদের আচরণ পরিবর্তন করেছে। আগে তারা সাধারণত একা চলত। এখন চলছে দলবদ্ধভাবে।
সম্প্রতি জার্নাল অব এশিয়া-প্যাসিফিক বায়োডাইভারসিটি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা-প্রবন্ধে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘পপুলেশন স্ট্যাটাস, স্পেশিওটেম্পোরাল ডিস্ট্রিবিউশন, অ্যান্ড হ্যাবিট্যাট ড্রাইভারস অব এন্ডেনজার্ড গ্যাঞ্জেস রিভার ডলফিনস ইন দ্য বুড়িগঙ্গা রিভার, বাংলাদেশ’।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজের নেতৃত্বে ১২ মাসব্যাপী (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৪) এ গবেষণা চালানো হয়। গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন সুমাইয়া খাতুন, আমির হামজা, মো. আমিনুর রহমান ও জাকিয়া সুলতানা শ্রাবণী।
তারা ডলফিনদের শনাক্ত করার জন্য নদীর মধ্যভাগ ধরে সকালে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ঘণ্টায় ৫-৬ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করেন। তারা এন-মিক্সচার মডেল অ্যানালাইসিস অনুসরণে দেখতে পান, ঢাকায় বুড়িগঙ্গার ২৭ কিলোমিটারজুড়ে প্রায় ২০টি ডলফিন জীবিত রয়েছে। প্রতি কিলোমিটারে ০.১৮ এনকাউন্টার রেটে ডলফিন পাওয়া গেছে, যা ২০১২ সালে ০.২৯ এবং ২০১৫ সালে ০.৪৮ ছিল। অর্থাৎ গত এক দশকে বুড়িগঙ্গায় ডলফিনের ঘনত্ব আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এটি পদ্মা (০.৫৩), সাঙ্গু-কর্ণফুলী (১.৩৬) কিংবা হালদা (০.৭৬) নদীর তুলনায় দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন।
গবেষণায় দেখা গেছে, আগে গাঙ্গেয় নদীর ডলফিনগুলো মূলত একা বিচরণ করত। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে এরা এখন দলগতভাবে বিচরণ করছে। জরিপে পাওয়া ডলফিনের ৮০.৭০ শতাংশই ছিল দলবদ্ধ। গড়ে প্রতি দলে ৪.১৮টি ডলফিন দেখা গেছে। এ ছাড়া বুড়িগঙ্গার দূষিত পানিতে দেশীয় মাছের সংকটে ডলফিনগুলো এখন ক্ষতিকর ‘সাকার ফিশ’ খেয়ে জীবন ধারণ করছে।
গবেষণায় দেখা যায়, মোট রেকর্ডকৃত ডলফিনের মধ্যে ৮৪.২১% প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৫.৭৯% ছিল বাচ্চা। মূলত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এবং এপ্রিল থেকে জুন—এই দুটি সময়ে ছানাগুলো দেখা গেছে। এটি প্রমাণ করে, বিষাক্ত পরিবেশ সত্ত্বেও ডলফিনের বংশবৃদ্ধি থামেনি, তবে এই বাচ্চাগুলো বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে কি না তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ডিসেম্বরে ডলফিনের উপস্থিতি ছিল সর্বোচ্চ (এনকাউন্টার রেট ০.৪৪/কিমি)। অক্টোবর ও বর্ষায় (জুলাই-আগস্ট) নদীটিতে কোনো ডলফিনের দেখা যায়নি। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় এবং বিষাক্ত বর্জ্যের ঘনত্ব অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় এরা উজানের প্রবাহ ছেড়ে ভাটির ধলেশ্বরী নদীর দিকে সরে যায়।
গাঙ্গেয় ডলফিন প্রায় দৃষ্টিহীন এবং শিকার করা ও চলাচলের জন্য সম্পূর্ণভাবে শব্দের প্রতিধ্বনি পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষণে দেখা যায়, নদীর যেসব অংশে নৌযান চলাচল বেশি, সেখানে ডলফিনের উপস্থিতি শূন্যের কোঠায়। সদরঘাট, হাসনাবাদ ও বড় বড় লঞ্চের ডকইয়ার্ড-সংলগ্ন অংশে গড়ে প্রতি মাসে ৬৬৫টির বেশি ভারী নৌযান চলাচল করে। লঞ্চ ও বড় কার্গোর ইঞ্জিনের তীব্র শব্দ পানির নিচে এমন এক ‘শব্দদানব’ তৈরি করে, যা ডলফিনের শ্রবণশক্তিকে বিকল করে দেয়। ফলে তারা শিকারকে শনাক্ত করতে পারে না।
গবেষণায় নদীর গভীরতাকে ডলফিনের উপস্থিতির সবচেয়ে শক্তিশালী ধনাত্মক চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গভীর পানি ডলফিনকে ইঞ্জিনের শব্দ ও উপরিভাগের মানবসৃষ্ট ঝামেলা থেকে সুরক্ষা দেয় এবং পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ নিশ্চিত করে।
গবেষণায় দেখা যায়, বুড়িগঙ্গার পানিতে গড়ে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ১.০৬ মিলিগ্রাম/লিটার, যা স্থানে স্থানে কমে ০.০৫ মিলিগ্রাম/লিটারে নেমে এসেছে। জলজ পরিবেশ ও মাছের টিকে থাকার জন্য সর্বনিম্ন ৪ মিলিগ্রাম/লিটার অক্সিজেন প্রয়োজন। ৫৭টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়ত ফেলা শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে বিষাক্ত এই পানিতে দেশীয় প্রজাতি মাছের চরম আকাল দেখা দিয়েছে। মাছ না থাকায় ডলফিনের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে, যার পরোক্ষ প্রভাবে এরা অনাহারে ও স্থানান্তরে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষকদের ম্যাপিং ও হিটম্যাপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৭ কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে না থেকে ডলফিনের উপস্থিতি মূলত তিনটি নির্দিষ্ট ‘পকেটে’ বা গভীর নদীর অংশে কেন্দ্রীভূত। সবচেয়ে বেশি আনাগোনা বা ঘনত্ব দেখা গেছে বছিলা এলাকায় (৪৪.০৬%), নদীর গড় গভীরতা বেশি থাকায় এবং শব্দদূষণ কম থাকায় ডলফিনগুলোর সবচেয়ে বেশি বিচরণ এই অংশে পাওয়া গেছে। এছাড়া ঘাটারচরে ৩০.১৬% এবং কামরাঙ্গীরচরে ২৫.৭৮% ডলফিনের উপস্থিতি মিলেছে। সদরঘাট অঞ্চলসহ মধ্য-বুড়িগঙ্গার বিশাল অংশ নৌযানের শব্দ ও দূষণের কারণে ডলফিনের জন্য প্রায় সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, বুড়িগঙ্গার মতো নদীতে ডলফিনের টিকে থাকার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করার যে সারভাইভাল ক্যাপাসিটি, তা মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মতো। বুড়িগঙ্গার ডলফিনও হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের পর্যাপ্ত খাবার নেই এখন। তাই তারা ক্ষতিকর সাকার ফিশ খাচ্ছে। বুড়িগঙ্গার যা অবস্থা তাতে ডলফিন খুব বেশিদিন টিকে থাকবে না, যদি না আমরা এই নদীকে দূষণমুক্ত করতে পারি।
তিনি বলেন, দুনিয়ার বহু শহর আছে যেখানে ডলফিন নেই কিন্তু ভালো পানি আছে। আমাদের সৌভাগ্য এখনো যে, আমাদের পানির অবস্থা এত খারাপ হওয়ার পরও ডলফিন টিকে আছে। আমরা যদি এই পানিকে দূষণমুক্ত করতে পারি, তাহলে ঢাকা শহরের মানুষও বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে ডলফিন দেখতে পাবেন।
খোলামোড়া-বছিলা এবং পাগলা-ফতুল্লা সংযোগস্থল এলাকাকে অবিলম্বে ‘ডলফিন সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করার সুপারিশ করেছেন গবেষকরা। অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, সংরক্ষিত অংশগুলোতে নৌযানের গতি প্রতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারের নিচে ও ইঞ্জিনের শব্দ পানির নিচে ১২০ ডেসিবেলের মধ্যে রাখার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা এবং বুড়িগঙ্গার ৫৭টি বর্জ্য নিঃসরণ পয়েন্টে ইটিপি চালুর মাধ্যমে বিষাক্ত রাসায়নিক পানি নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
মতামত দিন