রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার, ২০ বাংলাদেশি নিহতের তথ্য জানাল এসআরবি
রাশিয়ায় নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয়। সেখানে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে গিয়ে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টু।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির আশ্বাস দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের প্রতিশ্রুত কাজে নিয়োগ না দিয়ে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ব্যক্তিদের যুদ্ধ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না। এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য ছিল বলে ধারণা করছে এসআরবি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের সামনে পাঠানো হতো। তাঁদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা হলে সেই হামলার সূত্র ধরে প্রতিপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব নির্ণয় করা সম্ভব হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এসআরবি জানায়, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম, মধ্য ও শেষভাগ—এই তিন অংশে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।
জীবিতদের বিষয়ে এসআরবি জানায়, দুজন আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।
বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, মানব পাচারের ঘটনায় বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এসআরবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁরা জানতে পেরেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একই কৌশলে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারা গেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এখন পরিবারের সদস্যরা স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের মরদেহ দেখতে পারছেন না, এমনকি দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগও পাচ্ছেন না।
বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে এবং যাত্রার পূর্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক।
মতামত দিন