আওয়ামী লীগের মিছিলে 'পুলিশের ধাওয়া', তুরাগ থেকে দু'জনের মরদেহ উদ্ধার
ঢাকার তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে দুজনের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলে জানা গেছে।
পরিবারের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২২ জুন তুরাগ নদে ট্রলার যোগে একটি মিছিল বের করার চেষ্টা করছিল দলটির নেতাকর্মীরা। এ সময় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও পুলিশের ধাওয়া খেয়ে আতঙ্কে নদীতে ঝাঁপ দেন মিছিলকারীরা। এতে সবাই সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও দুইজন পানিতে তলিয়ে যান। পরে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার আশুলিয়া ও আমিনবাজার এলাকায় তাদের মরদেহ নদীতে ভেসে ওঠে।
নিহতরা হলেন তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার মো. শাহ আলমের ছেলে মো. সুমন (১৭), একই এলাকার আরিফ হাসান রাকিব (২৫) এবং রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা কফিল উদ্দিন মোল্লার ছেলে রনি মোল্লা (৩৫)। এদের মধ্যে সুমন ও রাকিব নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে জানায় পরিবারের সদস্যরা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে জানা গেছে, গত ২২ জুন বিকেল প্রায় তিনটার দিকে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৫-৩০ জন নেতাকর্মী নৌকাযোগে আশুলিয়ার রুস্তমপুর ঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার ঘাটের উদ্দেশে রওনা হন। তুরাগের নলভোগ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা কফিল উদ্দিন মেম্বার ও রানাভোলা এলাকার মামুন তাদের সার্বিক সহযোগিতা করেন।
স্থানীয়রা জানান, আশুলিয়া বাজার ঘাটে পৌঁছানোর পর নৌকা থেকে নামার চেষ্টা করলে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মী ও পুলিশ তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ধাওয়া করে। তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় নৌকার নোঙর তুলতে ব্যর্থ হন মিছিলকারীরা। পুলিশ নৌকার নোঙর ধরে ফেললে আতঙ্কিত হয়ে নেতা-কর্মীরা নদীতে ঝাঁপ দেন। এতে তীব্র স্রোতে সুমন ও রাকিব পানিতে তলিয়ে যান। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে মোট সাতজনকে আটক করে আশুলিয়া থানা পুলিশ।
এদিকে ২৪ জুন সকাল ৭টার দিকে গাবতলী লামারঘাট এলাকায় আরিফুল ইসলাম রাকিবের মরদেহ ভেসে ওঠে। আমিনবাজার নৌ পুলিশ প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে মরদেহটি উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। পরে পরিবার এসে শনাক্ত করে। এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা করেছেন রাকিবের বাবা।
নিহত রাকিবের বাবা আব্দুল হাই বলেন, ‘আমার ছেলে ২২ জুন ঘুরতে গিয়েছিল। পরে জানতে পারি বিএনপির নেতারা ও পুলিশ ধাওয়া দিলে আতঙ্কে সবাই নদীতে ঝাঁপ দেয়। সবাই উঠতে পারলেও রাকিব উঠতে পারেনি।’
এরপরে ২৫ জুন রাত সাড়ে ১২টার দিকে আশুলিয়া বাজার এলাকায় তুরাগ নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় মো. সুমনের মরদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। সুমনের বড় ভাই সালাহ উদ্দিন জানান, ‘সেদিন সুমন বলেছিল বন্ধুদের সঙ্গে নদীতে ঘুরতে যাচ্ছে। পরে বন্ধুদের কাছ থেকে জানি, মিছিলে গিয়েছিল। পুলিশ ধাওয়া দিলে নদীতে ঝাঁপ দেয়। সাঁতার না জানায় সুমন পানিতে তলিয়ে যায়।’
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, মরদেহটি ভাসতে দেখে ৯৯৯-এ ফোন করেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে আমাদের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় তার পকেট থেকে একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। ওই ফোনের সিম থেকে যোগাযোগ করা হলে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ শনাক্ত করেন।
এদিকে ২৪ জুন দুপুরে দিয়াবাড়ি ঘাট এলাকায় গোসল করতে গিয়ে রনি মোল্লা ডুবে মারা যান। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
রনির বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা জানান, তার ছেলে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার একটি হোটেলে কাজ করতেন। মানসিক সমস্যার কারণে তিনি মাঝেমধ্যে উদ্দেশ্যহীনভাবে বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতেন। তিনি দাবি করেন, রনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২২ জুনের পর তুরাগ নদ থেকে একটি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য তাদের জানা আছে। ওই দিন আশুলিয়া এলাকায় মিছিল ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলেও কোনো মৃত্যুর তথ্য তার জানা নেই।
এসব মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পেজ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে হামলার পর সাত নেতাকর্মী নিখোঁজ হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ‘তুরাগ নদে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মীর লাশ’ শিরোনামে যে তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশও। কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণায় কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন। একই সঙ্গে গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কাজ করছে।
এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানায় পুলিশ।
মতামত দিন