গত ৬ মাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুনের ঘটনা ১৮টি
দেশের বিভিন্ন স্থানে গত ছয় মাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হওয়ার ১৮টি ঘটনা ঘটেছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত এসব ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন খুন হয়েছেন। কোনো ঘটনায় একই পরিবারের দুজন, কোনো ঘটনায় তিনজন, আবার কোনো ঘটনায় চারজন কিংবা পাঁচজন সদস্যও খুন হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন রয়েছে।
এর আগে গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তার তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা (১৭) ও সিপা (১০)। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকাসক্ত এক যুবক এ হত্যাকাণ্ড ঘটান বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
শুধু রংপুর ও লক্ষ্মীপুর নয়, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হওয়ার আরও ১৬টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ১২টিতে একই পরিবারের দুজন করে, দুটি ঘটনায় তিনজন করে এবং তিনটি ঘটনায় চারজন করে খুন হয়েছেন। একটি ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচজন খুন হয়েছেন।
ঘটনাগুলোর কারণও এক নয়। কোথাও সম্পত্তি বা জমি নিয়ে বিরোধ, কোথাও মাদক, কোথাও দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ, আবার কোনো ঘটনায় প্রতিশোধ বা ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় সামনে এসেছে। কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৪টি ঘটেছে বাড়ি, ভাড়া বাসা, বসতঘর বা অন্য কোনো আবাসস্থলে। অর্থাৎ, পরিবারের সদস্যদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত ঘরও অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের স্থান হয়ে উঠেছে।
গত ছয় মাসের এসব ঘটনায় মে ও আগস্ট মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বিশেষভাবে বেশি ছিল। শুধু মে মাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হওয়ার পাঁচটি ঘটনা ঘটে। আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেও এমন পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, এই দুই মাসেই ১০টি ঘটনায় একই পরিবারের ২৭ জন খুন হয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঘটনাগুলোর পেছনে আলাদা আলাদা কারণ থাকলেও এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কিছু অভিন্ন সামাজিক সংকট রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, মাদকাসক্তি, প্রতিশোধের প্রবণতা এবং অপরাধের আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করতে না পারা—এসব কারণ একাধিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার করাই নয়, অপরাধের কারণ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের বিষয়েও পুলিশ কাজ করছে। ঘরের ভেতরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পত্তি বা আর্থিক বিরোধ এবং পূর্বশত্রুতার মতো বিষয় অনেক সময় ভূমিকা রাখছে।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে একসঙ্গে হত্যার ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে সমাজের ভেতরের নানা সংকটও জড়িত। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড মানুষের মধ্যে নিজের ঘর ও পরিবারের সদস্যদের নিয়েও নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করছে। ফলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ, মাদকাসক্তি, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি। অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে হত্যা মামলা বেড়েছে ১২৯টি।
একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হত্যার ১৮টি ঘটনা এবং সামগ্রিকভাবে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বৃদ্ধির এই চিত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে আবাসস্থলের ভেতরেই যখন পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার শিকার হচ্ছেন, তখন ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মতামত দিন