আজ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট
বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি)। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। এবারের নির্বাচনেই জাতীয় সংসদ ভোটের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এ নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মিলিয়ে মাঠে থাকবেন প্রায় নয় লাখ সদস্য। এর মধ্যে মূল দায়িত্বে থাকবেন পুলিশ ও আনসারের সাত লাখের বেশি সদস্য।
সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে দায়িত্ব পালন করবেন এক লাখ তিন হাজার সেনাসদস্য। এছাড়া পাঁচ জেলার ১৭টি আসনে বিশেষ নজরদারিতে থাকবেন পাঁচ হাজার নৌবাহিনী ও তিন হাজার ৫০০ বিমানবাহিনীর সদস্য। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করবে বিজিবি ও কোস্টগার্ড। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে কারচুপি ও সহিংসতা ঠেকাতে ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য বডিওর্ন ক্যামেরা পরে দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি আকাশপথে নজরদারিতে থাকবে ৫০০-এর বেশি ড্রোন।
ভোটকেন্দ্র ও ভোটার তথ্য
সূত্র জানায়, সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে ৪২ হাজার ৩৫৮টি। এর মধ্যে অতি সংবেদনশীল কেন্দ্র রয়েছে ৬ হাজার ৭৫০টি এবং সংবেদনশীল কেন্দ্র ৯ হাজার ১২০টি। প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার ৬৯০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৩৮ লাখ এবং নারী ভোটার ৫ কোটি ৭৯ লাখ। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন প্রায় ৭ হাজার জন। নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৮৫ লাখ।
প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল
এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫০টি রাজনৈতিক দল। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট আসন সংখ্যা ২৯৯টি। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় ওই আসনে ভোট স্থগিত করা হয়েছে।
মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন মোট ৮৩ জন— দলীয় ৬৩ জন ও স্বতন্ত্র ২০ জন। পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৫ জন— দলীয় ১ হাজার ৬৯২ জন এবং স্বতন্ত্র ২৫৩ জন
।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মিডিয়া কভারেজ
নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৩৫০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ১২ হাজারের বেশি দেশীয় পর্যবেক্ষক কাজ করবেন। জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ইইউ, আসিয়ান এবং বিভিন্ন দেশের নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
প্রায় ৫ হাজার সাংবাদিক নির্বাচন কভার করবেন। এর মধ্যে বিদেশি সাংবাদিক রয়েছেন ২৫০ জনের মতো।
গণভোট
জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি আজ অনুষ্ঠিত হবে দেশের ইতিহাসে প্রথম গণভোট। গণভোটে জনগণকে একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সংশোধনী বিষয়ে মতামত দিতে হবে। ভোটারদের 'হ্যাঁ' অথবা 'না' ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণভোটের জন্য আলাদা ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হবে এবং সাধারণ নির্বাচনের পরপরই গণভোট পরিচালিত হবে।
নির্বাচনী ইতিহাস ও চ্যালেঞ্জ
দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ভোট একদিকে উৎসবের প্রতীক হলেও; অন্যদিকে সহিংসতা, সংঘাত ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগও রয়েছে। গত ১২টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে মাত্র চারটিতে শেষ পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় ছিল। বাকি আটটিতে ভোটের মর্যাদা রক্ষায় সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমালোচনার মুখে পড়ে।
কঠোর নির্দেশনা
ইসি জানিয়েছে, কেবল বাহিনী মোতায়েনই নয়, যেকোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার তৎপরতায় প্রস্তুত থাকবে ফায়ার সার্ভিসও। মোবাইল কোর্ট প্রস্তুত রাখা হয়েছে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনকারীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদানের জন্য।
ভোটার সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। তাই ভোট ও ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। দিনশেষে সম্মিলিত চেষ্টায় একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের আশা করছে নির্বাচন কমিশন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, 'অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। ১৩তম জাতীয় নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি শেষে কমিশন অবাধ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য বদ্ধ পরিকর।'
ফলাফল ঘোষণা
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আজ রাত ১০টার মধ্যে প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে সব আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। চূড়ান্ত ফলাফল আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে কমিশনের।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে