সোমবার সারাদেশে আগুন, ভাঙচুর ও পিটুনিতে নিহত ১২৬
সোমবার (৫ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর সংঘর্ষ হয়। এতে নিহত হয়েছেন অনেক মানুষ। সব মিলিয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত ১২৬ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
গতকাল রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও নেতাদের বাড়ি-অফিস এবং সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা হয়েছে। আগুন-ভাঙচুরে হতাহত হয়েছেন অনেকে। খবর আজকের পত্রিকা।
রাজধানীতে একদিনে নিহত ৬০
রাজধানীতেও গতকাল অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪১ জন নিহতের তথ্য পাওয়া গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে। আর উত্তরায় থানা-পুলিশের গাড়িতে আগুন ও ব্যাপক তাণ্ডবে চারজন পুলিশসহ ১৯ জন নিহত হয়েছেন।
উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) কমান্ডার মো. নাজমুল ইসলাম গতকাল রাত পৌনে ৮টায় বলেন, “আজ এখন পর্যন্ত আমাদের হাসপাতালে ৯ জনের মরদেহ রয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ২০ জন চিকিৎসা নিয়েছে। তবে তারা কারা সেটি এখনো জানা যায়নি।”
কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, “আমাদের এখানে ৬ জনের মরদেহ এসেছে। সেই সঙ্গে আন্দোলনে আহত শতাধিক মানুষকে আমরা চিকিৎসা দিয়েছি। তবে সঠিক সংখ্যাটা এখন বলতে পারছি না।”
এদিকে গতকাল মধ্যরাতে উত্তরা পূর্ব থানার গেটে দিয়ে দেখা যায়, তিনজন পুলিশের মরদেহ রয়েছে, যার মধ্যে দুটি মরদেহের ঝোলানো অবস্থায় ছিল। আজমপুরের বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) সিঁড়িতে এক পুলিশের মরদেহ ঝোলানো অবস্থায় রয়েছে।
এ ছাড়া বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টরের স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের একটি গাছে মধ্যবয়স্ক এক যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ গাছে ঝোলানো অবস্থায় থাকতে দেখা যায়। সেটি ভিড় করে ছিল হাজারো মানুষ। তাদের অভিযোগ, যুবকটি ছাত্রলীগ করে। সে হাউজবিল্ডিং এলাকায় পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করেছে। তার ছোড়া গুলিতে এক শিশু আহত হয়েছে। তারা বলেন, গুলি শেষ হয়ে যাওয়ার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্রসহ অন্যান্য লোকজন তাকে ধরে ফেলে গণধোলাই দেয়। তারপর সে মারা গেলে পায়ে রশি বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যে ৪১টি লাশের মধ্যে ১৯ জন যাত্রাবাড়ী থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হন। বংশাল থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হন একজন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের নতুন ভবনের সামনে গুলিবিদ্ধ হন একজন। বাকিরা যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, বংশাল ও কাজলা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন।
শনির আখড়ায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গুলিতে ঘটনাস্থলেই অন্তত ৬ জন নিহত হয়। হতাহত হয় অনেকে।
১৭ জেলায় নিহত ৬৬
ঢাকার বাইরে থেকে পাঠানো খবর অনুযায়ী, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন পাঁচ তারকা হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এতে ১৮ জন নিহত ও ২০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
কুষ্টিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৮ জন নিহত এবং অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গতকাল দুপুরে কুষ্টিয়া মডেল থানা ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে হামলাকে কেন্দ্র করে পুলিশ গুলি চালালে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
খুলনার কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জি এম মোহসীন রেজাসহ তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। নিহত অন্যরা হলেন মোহসীন রেজার গাড়িচালক আলমগীর ও দেহরক্ষী ইয়াকুব।
চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের আলোচিত চেয়ারম্যান ‘বালুখেকো’ সেলিম খান ও তাঁর ছেলে নায়ক শান্ত খান গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগের পর এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় বালিয়া ইউনিয়নের ফরক্কাবাদ বাজারে এসে জনরোষে পড়েন। সেখানে নিজের পিস্তল থেকে গুলি করে রক্ষা পেলেও পার্শ্ববর্তী বাগাড়া বাজারে আবার জনতার হাতে আটক ও পিটুনির শিকার হন।
এ ছাড়া জেলার কচুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মামুনুর রশিদ গণপিটুনিতে ও ফরিদগঞ্জে বিক্ষুব্ধরা থানায় হামলার চেষ্টাকালে পুলিশের গুলিতে শাহাদাত (২০) নামের এক ছাত্রনেতা নিহত হয়েছেন।
গাজীপুরের শ্রীপুরে গুলিতে কমপক্ষে ৬ জন আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অর্ধশতাধিক। কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে আন্দোলনকারীরা হামলা চালালে আনসার সদস্যরা গুলি ছোড়েন। এতে অন্তত ২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক।
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ৬ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশসহ আহত হয়েছেন শতাধিক। এ ছাড়া হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে সোহেল আখঞ্জী (আনুমানিক ৩৫) নামে এক গণমাধ্যমকর্মীকে কুপিয়ে-পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
সাভারে গুলিবিদ্ধ হয়ে ১ নারীসহ ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডিউটি ম্যানেজার ইউসুফ আলী।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ৯ নম্বর পোড়াহাটি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম হিরনকে (৫৫) পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। একই সময় তাঁর গাড়িচালককেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। কালীগঞ্জ শহরের ঢাকালে পাড়ায় আগুনে পুড়িয়ে দুজনকে হত্যা করা হয়েছে।
বরিশালে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধুর ভাগনে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপির কালীবাড়ি রোডস্থ বাড়িতে সোমবার বিকেলে আগুন দেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ওই বাড়ি থেকে ৩টি মৃতদেহ উদ্ধার করেন।
বগুড়ায় দুজন নিহত হয়েছেন। গত রোববার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তাঁরা।
সাতক্ষীরা আশাশুনির প্রতাপনগরে তিনজনসহ জেলায় মোট ৪ জন নিহত হয়েছেন।
রাজশাহীতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন।
মানিকগঞ্জের শিবালয়ে নৌ পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে এক কলেজছাত্র নিহত হয়।
ফরিদপুরে গুলিতে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি জেলা শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার বাসিন্দা। আর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পুলিশের গুলিতে জুয়েল নামের একজন নিহত হয়েছেন।
টাঙ্গাইল সদরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ২ জন এবং ধনবাড়ী উপজেলায় ১ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পটুয়াখালীর বাউফলে এক যুবলীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে