১১ বছরের ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, ধর্ষণে অভিযুক্ত মাদরাসা শিক্ষক পলাতক
নেত্রকোণার মদন উপজেলায় মাদরাসা শিক্ষকের ধর্ষণে ১১ বছরের এক ছাত্রী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম আমান উল্লাহ সাগর। তিনি হজরত ফাতেমাতুজ জোহুরা মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক। বর্তমানে সপরিবারে পলাতক রয়েছেন।
এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মদন থানায় মেয়েটির মা শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন।
সাগর উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর মদন উপজেলার পাঁচহার গ্রামে ২০২২ সালে হজরত ফাতেমাতুজ জোহুরা মহিলা কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একই মাদরাসায় তার স্ত্রীও প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন। ভুক্তভোগী শিশুটি একই এলাকার বাসিন্দা এক বিধবা নারীর একমাত্র মেয়ে। জীবিকার তাগিদে শিশুটির মা সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। শিশুটি তার নানির কাছে থেকে ওই মাদরাসায় লেখাপড়া করত।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর ওই মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণনাশের ভয় দেখান। এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখে ওই শিক্ষক ছুটি নেন। এরপর থেকে তিনি আর মাদরাসায় আসেননি বলে জানিয়েছেন ওই মাদরাসার আরেক শিক্ষক। এদিকে ভুক্তভোগী শিশুটিও শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে গত পাঁচ মাস ধরে মাদরাসায় যায়নি।
পরবর্তী সময়ে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন ঘটলে তার মা সিলেট থেকে এসে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টি জানতে পারেন। শিশুটি মাদরাসার শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে জানায়। এরপর শিশুটিকে নিয়ে তার পরিবার মদন উপজেলার হাসপাতাল রোডে অবস্থিত স্বদেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তারের চেম্বারে যান।
চিকিৎসক ডা. সায়মা আক্তার জানান, শিশুটিকে তার মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে আনা হয়। সে সময় শিশুটি পেট ভারী লাগা এবং ভেতরে নড়াচড়া অনুভব করার কথা জানায়। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, শিশুটি মারাত্মক রক্তস্বল্পতায় (অ্যানিমিয়া) ভুগছে এবং শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
তিনি আরও জানান, পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে শিশুটি প্রায় ২৭ সপ্তাহের বেশি সময়ের গর্ভবতী, অর্থাৎ প্রায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শিশুটির বয়স মাত্র ১১ বছর, উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি—যা এই ধরনের গর্ভধারণকে অত্যন্ত উচ্চঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
চিকিৎসকের মতে, গর্ভস্থ শিশুর মাথার মাপ (প্রায় ৭৪ মিলিমিটার বাইপ্যারাইটাল ডায়ামিটার) মায়ের শারীরিক গঠন ও পেলভিক গহ্বরের তুলনায় অনেক বড়। ফলে স্বাভাবিক প্রসব প্রক্রিয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এছাড়া শিশুটির হিমোগ্লোবিন মাত্রা ৮.২, যা গুরুতর রক্তস্বল্পতার লক্ষণ। পাশাপাশি অপুষ্টি ও কৃমি সংক্রমণের সমস্যাও রয়েছে বলে জানান চিকিৎসক।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক প্রসব নিরাপদ নয়। কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োজন হতে পারে, তবে শিশুটির বয়স ও শারীরিক অবস্থার কারণে অস্ত্রোপচার ও অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ডা. সায়মা আক্তার জানান, শিশুটি প্রথমে খুবই ভীত ও সংকোচে ছিল। নিজের সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে বলতে পারছিল না। বর্তমানে সে ও তার পরিবার দুজনই গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে। শিশুটি এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না তার সঙ্গে কী ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি কী হতে পারে।
এই গাইনি চিকিৎসক আরও বলেন, শিশুটির বয়স অনুযায়ী তাকে শিশু বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকার কথা ছিল। কিন্তু তাকে গাইনি চিকিৎসকের কাছে জটিল অবস্থায় আসতে হয়েছে।
তিনি শিশুদের শারীরিক বিকাশ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে বলেন, সাধারণত ১১–১২ বছর বয়সে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায়। কিন্তু এই শিশুটি সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ওই মাদরাসার শিক্ষক মো. ছোটন জানান, ঘটনার বিষয়ে আগে পরিবার থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানা যায়নি। ঘটনার পর অভিযুক্ত শিক্ষক এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন এবং বর্তমানে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি এখন পরিবারসহ পলাতক এবং এলাকায় কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না।
মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, আমি এখানে নতুন যোগদান করায় এখনো বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না। তবে আইন তার নিজস্ব প্রক্রিয়া মেনে এগিয়ে যাবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে