তরুণদের আগ্রহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক বই
অমর একুশে বইমেলার ১৭তম দিন সোমবার (১৭ ফেব্রয়ারি) বিকেলে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কিছু তরুণ শিক্ষার্থী ‘আদর্শ’ প্রকাশনীর স্টলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে লেখা বইগুলো খুঁজছিলেন। আদর্শের স্টলকর্মীরা তাদের কয়েকটি বই দেখান। বইগুলো হলো- ‘সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান’, লেখক আহম্মদ ফয়েজ, কল্লোল মোস্তফার ‘শেখ হাসিনার দুঃশাসনের খতিয়ান’, সাইমুম পারভেজের ‘পতনের পূর্বাপর’, বিরূপাক্ষ পালের ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির সংস্কার’ এবং সালাহ উদ্দিন শুভ্রর উপন্যাস ‘আজাদি’।
‘আগামী’ প্রকাশনীর স্টলে গিয়েও দেখা যায় এমন দৃশ্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়কে কেন্দ্র করে ‘জুলাই ক্যালাইডোস্কোপ’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন লেখক হাসনাত আবদুল হাই। তরুণ পাঠকরা বইটি উল্টেপাল্টে দেখছেন। প্রতিদিন ১-২ কপি করে উপন্যাসটি বিক্রি হচ্ছে বলে জানান স্টলের দায়িত্বে থাকা লোকজন। এছাড়াও ‘প্রথমা প্রকাশনী’র সামনেও কিছু তরুণকে দেখা গেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক বই খুঁজতে। ‘প্রথমা’ প্রকাশ করেছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাক্ষ্য’ শীর্ষক একটি বই, লিখেছেন কবি সাজ্জাদ শরিফ। তারা আরও প্রকাশ করেছে আসিফ নজরুলের লেখা- ‘শেখ হাসিনার পতনকাল’, নজরুল ইসলামের লেখা- ‘স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধের পথ: রাষ্ট্র সংস্কার ও সংবিধান সংশোধন’, আল মাসুদ হাসানউজ্জামানের লেখা- ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান: নতুন পথে বাংলাদেশ’।
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত কবি হাসান রোবায়েতের লেখা- ‘আমরা কথা বলি কেননা নীরবতা ফ্যাসিস্টের ভাষা’, মঈন শেখের লেখা- ‘জুলাইয়ের অশেষ পাখিরা’, জুলাই অভ্যুত্থানের বিষয়কে কেন্দ্র করে কবি আলতাফ শাহনেওয়াজ লিখেছেন- ‘তবু আমরা জেগে থাকবো’ গল্পগ্রন্থ। এ ছাড়া ‘পুথিনিলয়’ প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে ইব্রাহিম খলিল শাওনের লেখা- ‘রক্তঝরা জুলাই’।
বইমেলা ঘুরে দেখা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পটভূমি, কারণ, প্রভাব, গণমাধ্যমে ভূমিকা ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে লেখা বইগুলো এবারের বইমেলায় পাঠক ও দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বলা চলে, মেলায় আগত পাঠকের আগ্রহের অন্যতম জায়গায় রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক বই। বিশেষত তরুণ পাঠকরা চেষ্টা করছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অজানা দিকগুলোকে জানতে। সংগ্রহে রাখতে।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রাশেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেই আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই কিন্তু মানুষের মধ্যে গণঅভ্যুত্থান নিয়ে একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ কেমন হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের মানুষের অংশগ্রহণ এসব জানার আগ্রহ’।
রাশেদ আরও বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ কীসের ভিত্তিতে ছিল, সেই ভিত্তিটা কী এখন পাওয়া যাবে কি যাবে না, সেসব জানতেই মূলত তরুণরা জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে প্রকাশিত বইগুলো পড়তে চায়’।
‘প্রথমা’ স্টলের সামনে গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক বই নেড়েচেড়ে দেখছিলেন সালমান সিদ্দিকী। তিনি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে নিয়ে যতগুলো বই বেরিয়েছে মেলায়, আমার কাছে মনে হয় এই বইগুলো যারা লিখেছেন আগ্রহের জায়গা থেকে লিখেছেন এবং যারা সংগ্রহ করছেন তারাও আগ্রহের জায়গা থেকে সংগ্রহ করছেন। এই অভ্যুত্থানে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন। এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে। এই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে জেগে উঠেছে। যেহেতু এই আন্দোলনটা মানুষ খুব কাছ থেকে দেখেছে, লড়াই করেছে, সংগঠিত করেছে। যারা কাছ থেকে দেখেছেন তারা যেমন এগুলো লিখছেন, যারা আন্দোলনের মধ্যে ছিলেন এসব নিয়ে খোঁজ-খবর রাখার জন্য কিন্তু বইগুলো অনেকে সংগ্রহ করছেন’।
ভিন্ন কথাও বলেন মেলায় আসা ঢাকা জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসার আবিদুর রহমান নামে এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘শুধু জুলাই অভ্যুত্থানভিত্তিক তেমন আগ্রহ হচ্ছে না, কারণ নিজ চোখে দেখা এই অভ্যুত্থান। অদেখা যেগুলো- সেগুলোর প্রতি আমার আগ্রহ বেশি। ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ এসব। তবে, জুলাই অভ্যুত্থানের কারণে রাজনৈতিকভাবে আমাদের চিন্তাধারা বিকশিত হয়েছে’।
বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে দায়িত্বে থাকা বিক্রয়কর্মীরা জানালেন, এবারের মেলায় তরুণদের অন্যতম আগ্রহের জায়গা ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান। ‘আদর্শ’ প্রকাশনীর স্টলকর্মী ফারদিন বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক বইগুলো নিয়ে পাঠকের বেশ আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। পাঠকরা এসে জিজ্ঞেস করছেন জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে কী বই এসেছে। তখন আমরা বইগুলো সাজেস্ট করে থাকি। পাঠকের মধ্যে আসলে বেশ আগ্রহ। দেখছেন, কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে প্রামাণ্য সাপেক্ষে বা বাসায় সংগ্রহে রাখবে সে কথা চিন্তা করে এগুলো নিয়ে যাচ্ছেন’।
‘সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান’ সম্পর্কে লেখক আহম্মদ ফয়েজ বলেন, ‘এটি যতটা না বই, তারচেয়ে বেশি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসজুড়ে হয়ে যাওয়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য ব্যাপক; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সময়ে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ও দলীয় দালালির ফলে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কাগজে ছাপা সংবাদপত্রের গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে কমতে থাকলেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এসে সংবাদপত্র হঠাৎ করেই যেন পুরোনো জৌলুস পেয়েছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়ে এটিই সম্ভবত প্রথম কোনো বই। এই বইটির মাধ্যমে একজন পাঠক, গবেষক এবং শিক্ষার্থী ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন বলে লেখক মনে করেন’।
সব মিলিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাপ এবার ভালোভাবেই পড়েছে বইমেলায়। তরুণরা ছাড়াও বিভিন্ন বয়সী পাঠকরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক বইপুস্তকের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বেশ কিছু কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোও পাঠক খুঁজে নিচ্ছেন আগ্রহ ভরে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে