Views Bangladesh Logo

বাংলাদেশ বেতারের ‘ড্রেস কোড’ নির্দেশনা ঘিরে সমালোচনা

বাংলাদেশ বেতারের ফেসবুক লাইভ সংবাদ উপস্থাপকদের জন্য নতুন পোশাকবিষয়ক নির্দেশনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বেতারের বার্তা বিভাগ থেকে জারি করা একটি অফিস আদেশের ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে নারী ও পুরুষ সংবাদ উপস্থাপকদের পোশাক সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ছড়িয়ে পড়া ওই নির্দেশনায় নারী উপস্থাপকদের জন্য ‘বড় টিপ’, ‘একপাশে ওড়না’, ‘টি-শার্ট’ ও ‘গেঞ্জি’ পরিধান না করার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে পুরুষ উপস্থাপকদের জন্য ‘গেঞ্জি’ ও ‘গোলগলা টি-শার্ট’ পরিধানে নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ রয়েছে। নির্দেশনাটি মূলত ফেসবুক লাইভে সংবাদ পাঠের সময় উপস্থাপকদের পোশাক ও উপস্থাপনা আরও ‘শালীন ও উপযোগী’ রাখার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে বলে অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে উপস্থাপকদের জন্য পোশাকবিষয়ক নির্দেশনাকে ‘অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সংবাদ উপস্থাপনার মূল বিষয় হওয়া উচিত সংবাদ ও পেশাদারিত্ব, পোশাক নয়। বিশেষ করে নারী উপস্থাপকদের পোশাক নিয়ে আলাদা করে নির্দেশনা দেওয়াকে অনেকে ‘লিঙ্গবৈষম্যমূলক’ বলেও মন্তব্য করেছেন।


বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অথ-বিষয়ক সম্পাদক নুজিয়া হাসিন রাশা বলেন, বাংলাদেশে টিপ পরা বা ওড়না পরাকে কেন্দ্র করে নারীরা বহুবার সামাজিক হয়রানি ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এমন বাস্তবতায় রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এসব বিষয়কে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা সেই বৈষম্যমূলক মানসিকতাকেই পরোক্ষভাবে বৈধতা দিচ্ছে, হয়রানিকে বৈধতা দিচ্ছে। বড় টিপ বা ওড়না নিয়ে যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা ধর্মীয় রক্ষণশীল চিন্তার প্রভাবমুক্ত নয়।

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকতা পেশায় নারীরা এখনো নানা ধরনের লৈঙ্গিক বৈষম্য, হয়রানি ও পেশাগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। সেসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে পোশাক ও ব্যক্তিগত সাজসজ্জাকে নিয়ন্ত্রণের বিষয় বানানো অগ্রাধিকারের ভুল নির্দেশনা এবং নারীর স্বাধীন পেশাগত পরিচয়কে সংকুচিত করারই একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রতীয়মান হচ্ছে।

লেখক ও অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান ড্রেস কোড ঠিক করতে পারে। কিন্তু সেটা যদি শুধু নারীদের জন্য ঠিক করে তাহলে সেটা সমস্যাজনক। কারণ এটা নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। নারীদের পোশাক ঠিক করার মধ্য দিয়ে পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয়।

টিপ কোনোভাবেই ড্রেসকোডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কে কীভাবে পোশাক পরবে, ওড়না কোনপাশে রাখবে তা কেউ ঠিক করে দিতে পারে না।

রুমী আরও বলেন, শালীনতা, ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদি রক্ষার দায় একা নারীদের ওপর যুগ যুগ ধরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে যা অত্যন্ত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার প্রকাশ এবং এর মাধ্যমে নারীর চলাচল, সক্রিয়তা, স্বতঃস্ফূর্ততা বাধাগ্রস্ত হয়। এসবের মধ্যে দিয়ে নারীদের দমন করতে চায় পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো।

‘নারী অঙ্গন’র সম্পাদক নাদিরা ইয়াসমিন বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীরা এমনিতেই প্রায় পাওয়ারলেস। জাতীয় কোনো সংবাদমাধ্যম যখন নারীর পছন্দমতো পোশাক ও সাজগোজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, অফিসিয়ালি সেটা নারীর পাওয়ারকে আরও কমিয়ে প্রান্তিক করে দেয়। তাছাড়া এর মাধ্যমে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নারীর ওপর নানাবিধ বিধিনিষেধ চাপানোর সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হবে অঘোষিতভাবে। আমি প্রত্যাশা করব এরকম নারী-স্বাধীনতা বিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে বাংলাদেশ বেতার বেরিয়ে আসবে। না হলে আমরা নারী সংগঠনগুলো মিলে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলব বাংলাদেশ বেতারের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বেতারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ