Views Bangladesh Logo

বছরজুড়ে সমাপনী

আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতেই শেষ

দেখতে দেখতে কালের গহ্বরে বিলীন হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আরও একটি বছর। আসছে নতুন বছর ২০২৪। পৃথিবী সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সৌরজগতের নিখুঁত নিয়মে প্রতিদিন সূর্যোদয় হয়। প্রকৃতির নিয়মেই নতুন আরেকটি দিন, আরেকটি মাস, আরেকটি বছর আসে। আগামীর দিনগুলোতে অনিশ্চয়তা কেটে গিয়ে শুভময়তা ছড়িয়ে যাবে পৃথিবীময়, এ আশায় বুক বাঁধে মানুষ। তবে ২০২৩ সাল রাজনৈতিক দিক দিয়ে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হলেও দেশের সাধারণ মানুষ বছরটিকে মনে রাখবে ভিন্নভাবে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতেই বছর শেষ হয়ে গেছে তাদের। সারা বছরই নিত্যপণ্যের বাড়তি মূল্য জনজীবনে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করেছে। বেড়েছে সব ধরনের সেবার দাম।

সংসার চালাতে রীতিমতো গলদ্ঘর্ম অবস্থা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের। পঞ্চাশ হাজারের বেশি আয় করেও পাঁচজনের সংসারের ব্যয় মেটানো বিশাল চ্যালেঞ্জ। আর যারা কিছুটা সঞ্চয় করেছিলেন, তারাও জমানো টাকা ভাঙছেন। আর নিম্ন-আয়ের মানুষের অবস্থা আরও খারাপ। জীবনসংগ্রামে বেঁচে থাকার তাগিদে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নিচ্ছেন। অনেকে পরিবারসহ গ্রামে চলে গেছেন আবার কেউ পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে নিজে শহরে থাকছেন। সবমিলিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে সঞ্চয় ভাঙার পাশাপাশি ধারদেনা করাটা এখন একরকম স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া খেটে খাওয়া মানুষের অর্থাৎ যারা দিন এনে দিন খান, তাদের কষ্টের সীমা নেই।

কেমন গেল বিদায়ী ২০২৩ সালের বাজার পরিস্থিতি? সংক্ষেপে ওপরের দুই প্যারাই তার উত্তর। প্রতিবেদন তৈরির জন্য রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়। দু-একজন তো বলেই বসলেন, জানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চান কেন? আপনি রিপোর্ট করেন, বাজারের চালচিত্র ঠিকই জানেন। কথা ঠিক, তবে প্রতিবেদক একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, গবেষণা, অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে। সেখানে তার নিজের মনগড়া কিছু থাকার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, আট বছরের ব্যবধানে দেশের মানুষের মাসিক গড় আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দেশে এখন একজন মানুষের মাসিক গড় আয় ৭ হাজার ৬১৪ টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল ৩ হাজার ৯৪০ টাকা।

সম্প্রতি বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ সালের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। অথচ গত ২০১৬ সালের পর থেকে মানুষের ব্যয় বেড়েছে অন্তত কয়েকগুণ বেশি। সরকারি এই সংস্থার জরিপে নভেম্বর মাসে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ সদ্য শেষ হওয়া মাসে কোনো পণ্য কিনতে গত বছরের নভেম্বর থেকে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ বাড়তি দাম গুনতে হয়েছে ক্রেতাদের। এর আগে অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ছিল ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত বছরের নভেম্বরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অক্টোবরে ছিল ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ ও সেপ্টেম্বরে ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। বিবিএসের তথ্য বলছে, চলতি বছরের খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি বছরের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। অথচ বিবিএসের তথ্যের সঙ্গে আরেকটি সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য মিলিয়ে দেখলে কিছুটা তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। চলতি বছরের ডিসেম্বরের সঙ্গে গত বছরের একই সময়ে বিভিন্ন পণ্যের দামে বিস্তর ফারাক। চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় একসময় একটি স্লোগান জনপ্রিয় ছিল। ‘বেশি করে আলু খান, বেশি করে আলু খেয়ে ভাতের ওপর চাপ কমান।’ সেই স্লোগানের দিন এখন আর নেই। টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, বাজারে এই পণ্যটির দাম ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা। অথচ, গত বছরের সবটুকু সময়জুড়ে আলুর কেজি ছিল ২২ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে। এক বছরের ব্যবধানে মূল্যবৃদ্ধি ৯২ দশমিক ৩১ শতাংশ। যদিও এ সময়ে সরু, মাঝারি ও মোটা চালের দাম কমেছে ২ থেকে ৭ শতাংশ।

ডাল-ভাতে জীবন
২০২৩ সাল বছরজুড়েই কিছুটা ওঠানামা থাকলেও অনেকটা সহনীয় ছিল চাল ও ডালের বাজার। টিসিবির পরিসংখ্যান বলছে, সারা বছরে স্বর্ণা/চায়না ইরি প্রজাতির মোটা চালের দর ৪৮ থেকে ৫২ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। গত বছরে যা গড়ে ছিল ৪৮ থেকে ৫৫ টাকার ঘরে। সে হিসাবে দাম কমেছে ২ দশমিক ৯১ শতাংশ। একই সময়ে পাইজাম/লতা প্রজাতির মাঝারি চালের দর ছিল ৫২ থেকে ৫৫ টাকার ঘরে। এর আগে গত বছর এই চালের দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। দাম কমার হার ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এ ছাড়া নাজিরশাইল ও মিনিকেট প্রজাতির সরু চালের দর ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬২ থেকে ৭৫ টাকার মধ্যে। সে হিসাবে বছরজুড়ে দর কম ছিল ৫ দশমিক ১১ শতাংশ।

বাঙালির প্রধান খাবার ভাত। এক সময় প্রবাদ ছিল, মাছে-ভাতে বাঙালি। তবে সময়ের বিবর্তণে প্রবাদ পরিবর্তন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ডাল-ভাতে বাঙালি। বছরজুড়ে মাছের বাজার সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় ডালই হয়ে উঠেছে ভাতের সঙ্গে খাওয়ার প্রধান আমিষজাতীয় খাবার। গত বছরের তুলনায় দরে কোনো পরিবর্তন হয়নি মুগ ডালের। পণ্যটির দাম বছরজুড়ে ৯৫ থেকে ১৩৫ টাকার মধ্যে ছিল। এ ছাড়া ১০৫ থেকে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ধরনের মসুর ডালের দর প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। চাল-ডালের পাশাপাশি দাম কমার তালিকায় আছে আটা-ময়দাও। গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির পর এখন পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে দামে।

ধরাছোঁয়ার বাইরে মাছ-গরু-খাসি
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারীর প্রতিদিন যথাক্রমে ৭০-৮০ গ্রাম এবং ৫০-৬০ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তা নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য অসম্ভব। গরু ও খাসির মাংসের দাম বছর শুরুর আগে থেকেই আকাশছোঁয়া। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, খাসির মাংসের কেজি বছরজুড়ে ছিল ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে। গত বছর খাসির মাংসের কেজি ছিল ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকা। এক বছরে দর বেড়েছে ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। গরুর মাংসও কম নয়। বছরজুড়ে গরুর মাংসের প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। এক বছর আগে এর দাম ছিল ৬৬০ থেকে ৭০০ টাকা। যদিও টিসিবির এই দরের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক অনেক। ক্ষেত্র বিশেষে ৮০০ টাকার বেশি দামেও গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে।

বছরের শেষে যদিও দর একটু কমে এসেছে। তবে এখনো এই দরে গরুর মাংস কিনে খাওয়ার মানুষের সংখ্যা কম। একটু আগেই মাছ নিয়ে প্রচলিত প্রবাদটি তুলে ধরেছিলাম। টিসিবির হিসাবে, বাজারে রুই ২৮০ থেকে ৪৫০ টাকা ও ইলিশ ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। রুই মাছের প্রকৃত চিত্র অনেকটা কাছাকাছি থাকলেও ইলিশের দর ২ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া বাজারে তেলাপিয়া ২৬০-২৯০, পাঙাশ ২৪০-২৫০, পাবদা ৪৫০-৬০০, কই ২৮০-৩৫০, কাতল ৩০০-৫০০, শিং ৫৫০, রুপচাঁদা ১ হাজার এবং বাটা ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় প্রতিটি মাছের দর প্রায় ৫০ থেকে ২০০ টাকার মতো বেড়েছে।

ডিম-মুরগির বাজারে অস্বস্তি
২০২৩ সালে ডিম ও মুরগি নিয়েই সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ছিলেন সাধারণ মানুষ। সরকার বাধ্য হয়ে ডিমের দাম বেঁধে দিলেও বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। পরে বাধ্য হয়ে আমদানির পথে হাঁটে সরকার। এতে দর কিছুটা কমেছে। টিসিবির তথ্য বলছে, বছরজুড়ে ডিমের হালি ছিল ৪২ থেকে ৬০ টাকা। এক বছর আগে এই দর ৩৬ থেকে ৩৮ টাকার মধ্যে ছিল। সে হিসাবে দর বৃদ্ধির হার ১৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গরু-খাসির মাংসের দামের ঊর্ধ্বগতিতে সস্তায় একমাত্র প্রাণিজ আমিষের উৎস ছিল মুরগি। তবে এই পণ্যেও পড়েছে সিন্ডিকেটের থাবা। টিসিবির তথ্য অনযায়ী, গত বছরের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও দেশি মুরগির দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ। বছরজুড়ে ব্রয়লার মুরগির গড় দাম ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকার ঘরে। এ ছাড়া দেশি মুরগির দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

সবজি ও মসলায় নাভিশ্বাস
বাজারে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন শাক-সবজি ও মসলাজাতীয় পণ্য। এসব পণ্যের বাজারদর শুনেই নাভিশ্বাস সাধারণ মানুষের। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে বেশ কিছু কৃষিপণ্যের দাম বেড়েছে আড়াইগুণ বা আড়াইশ শতাংশ। এসব পণ্যের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার পরও তা খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে বেশ চড়া দামে। রাজধানীর খুচরা বাজারে মানভেদে কেজিপ্রতি বেগুন ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শিম ৪০ থেকে ৬০, পাকা টমেটো ৮০ থেকে ৯০, কাঁচা টমেটো ৫০ থেকে ৬০, কাঁচামরিচ ১০০, শসা ৫০ থেকে ৬০, করলা ৮০, গাজর ৭০ থেকে ৮০, পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ এবং পাতা ও ফুলকপি প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে এক বছর আগে এসব পণ্যের দাম প্রায় ২০ শতাংশ কম ছিল।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (ডিএএম) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরের মধ্যে দেশি পেঁয়াজের দাম ২০০ শতাংশ ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ২৮৮ শতাংশ বেড়েছে। পেঁয়াজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে দেশি রসুনের দামও। পণ্যটির দাম ৯১ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও আমদানি করা চায়না রসুনের দাম বেড়েছে ৬৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। আবার টিসিবির হিসাবে দেশি পেঁয়াজ ১৭৫ শতাংশ বেড়েছে। আমদানি করা পেঁয়াজে বেড়েছে ২৫৮ শতাংশ। দেশি রসুনের দাম বেড়েছে ২৪০, আমদানি করা চায়না রসুনে বেড়েছে ৯৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। পেঁয়াজ, রসুনের সঙ্গে বেড়েছে মসলাজাতীয় পণ্য আদার দামও। দেশি আদার দাম গত বছর ছিল কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।

বর্তমানে এর দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। পণ্যটির দাম বেড়েছে ১০৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। আমদানি করা আদা ছিল ১০০ থেকে ১৬০ টাকা। বর্তমানে তা ২০০-২৬০ টাকা। বেড়েছে ৭৬ দশমিক ৯২ শতাংশ। জিরা প্রধানত আমদানি করা হয়ে থাকে। এই জিরার দাম গত বছর ছিল কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৫৭০ টাকা। বর্তমানে এর দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা। পণ্যটির দাম বেড়েছে ৯৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। একইভাবে দাম বেড়েছে অন্যান্য পণ্যেরও। কখনো খরা, কখনো বৃষ্টি কিংবা অপর্যাপ্ত আমদানির অজুহাতে প্রায় প্রতিনিয়তই বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। তবে নতুন বছরে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকবে, সহজেই আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারার প্রত্যাশা দেশের সাধারণ মানুষের।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ