বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ভালো না থেকে উপায় নেই: বিবিসি বাংলাকে ড. ইউনূস
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের কোনো অবণতি হয়নি জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ভালো না থেকে উপায় নেই। আমাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ, আমাদের পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা এত বেশি এবং ঐতিহাসিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে আমাদের এত ক্লোজ সম্পর্ক, সেটা থেকে আমরা বিচ্যুত হতে পারবো না।
তবে মাঝখানে কিছু কিছু দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, আমি বলেছি মেঘ দেখা দিয়েছে। এই মেঘগুলো মোটামুটি এসেছে অপপ্রচার থেকে। অপপ্রচারের সূত্র কারা সেটা অন্যরা বিচার করবে। কিন্তু এই অপপ্রচারের ফলে আমাদের সঙ্গে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। সেই ভুল বোঝাবুঝি থেকে আমরা উত্তরণের চেষ্টা করছি।
ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এসব কথা বলেছেন। সোমবার (৩ মার্চ) সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংস্কার ও নির্বাচন, ছাত্র নেতৃত্বের নতুন দল গঠনসহ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কথা বলেছেন।
বিবিসি বাংলাকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতারাই দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার প্রথম চেষ্টা ছিল দেশের ধ্বংসস্তূপ থেকে আসল চেহারাটা বের করে আনা। মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ করে আনা। এরপর আস্তে আস্তে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করা। আমার প্রথম চিন্তাই ছিল সংস্কার। এর কারণ হলো, যে কারণে এসব ঘটনা ঘটেছে, ফ্যাসিবাদী সরকার চলতে পেরেছে। ১৬ বছর ধরে চলতে পেরেছে, আমরা কিছুই করতে পারি নাই। তিন–তিনটা নির্বাচন হয়ে গেল, ভোটারের কোনো দেখা নাই। এই যে অসংখ্য রকমের দুর্নীতি এবং ব্যর্থতা, মিস রুল ইত্যাদি-সেখান থেকে আমরা কীভাবে টেনে বের করে আনব। টেনে বের করে আনতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো করতে হবে।
সংস্কার প্রশ্নে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সংস্কার তো এখনো শুরু করিনি। গত ছয় মাসে বহু পরিবর্তন এসেছে। যে ধ্বংসাবশেষ থেকে এসেছিলাম, তার নতুন চেহারা আসছে। ভেসে উঠছে যে, আমরা অর্থনীতি সহজ করেছি। দেশ-বিদেশের আস্থা অর্জন করেছি। এটা তো পরিষ্কার, সারা দুনিয়ায় আমরা আস্থা স্থাপন করতে পেরেছি। এটা কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না যে, আমি অমুক দেশের আস্থা অর্জন করতে পারিনি। যে দেশেই বলুন, তারা আমাদের ওপর আস্থা স্থাপন করেছে। তারা বলছে, আমরা অতীতে যা করি নাই তার চেয়ে বেশি করব এখন, যেহেতু আমরা দেখছি যে সুন্দরভাবে সরকার চলছে এখন। অবিশ্বাস্য রকমের সহায়তা দিয়েছে তারা।
ড. ইউনূস বলেন, এটা একটা অপরিচিত জগৎ, আমরা এসেছি। আমরা কোনো এক্সপার্টকে এখানে এনে বসাই নাই। আমরা যার যার জগৎ থেকে এসেছি, নিজের মতো করে চেষ্টা করছি কীভাবে করতে পারি। তার মধ্যে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। কিছু কাজে ভালো করেছি, কিছু কাজে ভালো করতে পারেনি। এটা হতে পারে। এটা আমি তো অস্বীকার করছি না।
এখন পর্যন্ত আত্মতৃপ্তি পাওয়ার মতো কোনো কাজ হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কোনোটাই ভালো হয়নি সে অর্থে। আমাদের ইচ্ছা তো অনেক। রাতারাতি দেশ পরিবর্তন করতে চাই। সেটাতো আমরা পারি নাই। সময় লাগবে। আমরা চেয়েছিলাম যে এখনই আমরা সংলাপটা শুরু করব। এটাও পারি নাই। সংলাপ শুরু হতে হতেও দেরি হয়ে যাচ্ছে। এগুলো আর কি। যেগুলো সময়মতো আমরা করতে চেয়েছি, ওই সময়ে করতে পারিনি।
আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সমালোচনা প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, অবনতিটা কোন পয়েন্ট থেকে হয়েছে? এটা বলতে হবেতো আমাকে। আপনি বলছেন অবনতি হয়েছে। কোন রেফারেন্স পয়েন্ট থেকে অবনতিটা হয়েছে? সেটা না দিলেতো আমরা বুঝতে পারব না।’ তিনি দাবি করেন, অপরাধের পরিমাণ মোটেই বাড়েনি। আগের মতোই রয়েছে।
পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর করতে সময় লাগছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, চেষ্টা করছি আমরা। সমস্যা আপনিও জানেন, আমিও জানি। প্রথম দিকে সমস্যা ছিল যে পুলিশ বাহিনী যাকে দিয়ে আমরা কাজ করাচ্ছিলাম, তারা ভয়ে রাস্তায় নামছিল না। দুই দিন আগে তারা এদেরকে গুলি করেছে। কাজেই মানুষ দেখলেই সে ভয় পায়। কাজেই তাকে ঠিক করতে করতেই আমাদের কয়েক মাস চলে গেছে। এখন মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে। এখন আবার নিয়মশৃঙ্খলার দিকে আমরা রওনা হয়েছি। কাজ করতে থাকব।
তবে তিনি স্বীকার করেন যে, পুলিশকে এখনো সেভাবে সক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেক উন্নতি হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক এবং জাতীয় ঐক্য প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমার তো অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। কেউ আমাকে অসমর্থন করছে, এ রকম কোনো খবরতো আমি পাই নাই এখনো। সবাই সমর্থন করছে, সবাই চাচ্ছে যে সুন্দরভাবে দেশ চলুক, তাদের সবার মধ্যে ঐক্য আছে। রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। কিন্তু তার মানে এই নয়, ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরেছে। এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে নাই।
ছাত্রদের রাজনৈতিক দল ও গঠন তাদের কার্যক্রমে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেয়ার অভিযোগ আসছে কিছু মহল থেকে, এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকার কোনো সহায়তা করে না। যে রাজনীতি করতে চায়, সে নিজেই ইস্তফা দিয়ে চলে গেছে। তিনজন ছাত্র প্রতিনিধি ছিল সরকারের ভেতরে। যিনি রাজনীতি করতে মন স্থির করেছেন, তিনি ইস্তফা দিয়ে সরকার থেকে চলে গেছেন। উনি প্রাইভেট সিটিজেনশিপে রাজনীতি করবেন, কার বাধা দেয়ার কী আছে?
তিনি আরও বলেন, সরকার হিসেবে আমাদের কোনো পজিশন নাই। রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ মোটেও সঠিক নয়।
সেনাবাহিনীও সর্বাত্মকভাবে এই সরকারকে সহযোগিতা করছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, সবাই একসঙ্গে কাজ করতে না পারলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে বা বিপন্ন হতে পারে।
সেনা প্রধানের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, এটা ওনার বক্তব্য উনি বলবেন। আমার ওনাকে এনডোর্স করা না করারতো বিষয় না।
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না? সরকার প্রধান হিসেবে কী মনে করেন? এমন প্রশ্নে ড. ইউনূস বলেন, এটা
তো সব সময় থাকে। একটা পলাতক দল দেশ ছেড়ে চলে গেছে বা তাদের নেতৃত্ব চলে গেছে। তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এটাকে আনসেটেল করার জন্য। এটাতো সব সময় থ্রেট আছেই। প্রতি ক্ষণেই আছে, প্রতি জায়গাতেই আছে। কাজেই এটাতো সব সময় থাকবে।
হুমকিটা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ থেকে আসছে কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, অবশ্যই। এটাতো অবভিয়াস। তারা মাঝে মাঝেই ঘোষণা করছে। বক্তৃতা দিচ্ছে। অ্যাড্রেস করছে। আপনি-আমরা সবাই শুনছি। মানুষ উত্তেজিত হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা প্রত্যেকটা সুপারিশ দেব। সুপারিশের সঙ্গে কথা থাকবে যে, আপনার রাজনৈতিক দল এটা কি সমর্থন করে? এটাতে রাজি আছেন? রাজি থাকলে বলেন, রাজি না থাকলে বলেন। বা এই যে সুপারিশটা আছে সেটার মধ্যে যদি কোনো একটা সংশোধনী এনে রাজি হবেন, সেটা বলেন। এটা কি নির্বাচনের আগে সংশোধন করা ঠিক হবে নাকি নির্বাচনের পরে–সব প্রশ্নের এখানেই সমাধান আছে। রাজনৈতিক দলকে শুধু বলতে হবে কোনটা? সবকিছু মিলালে আমরা এটা ঠিক করব কোন সুপারিশে সবাই একমত হয়েছে। সেটা আলাদা করব যে এটাতে সবাই একমত হয়েছে। এ রকম যে সমস্ত সুপারিশে তারা একমত হয়েছে, সেগুলো আমরা আলাদা একটা কাগজে নিয়ে আসব যে এই সব বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে। তবে এটাকে আমরা বলব একটা চার্টার–জুলাই চার্টার।
সবাইকে আহ্বান জানাব, আপনারা সবাই যেহেতু একমত হয়েছেন এটাতে সই করে দেন। জুলাই চার্টারের মতোই আমরা চলব। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই নির্বাচনটা হবে। নির্বাচনের আগে যেটা বলেছেন সেটা নির্বাচনের আগে হবে, যেটা নির্বাচনের পরে বলেছেন সেটা নির্বাচনের পরে হবে। এটা আপনাদের বিষয়। কিন্তু আপনারা একমত হয়েছেন। সেই ঐকমত্যই আমরা গঠন করার চেষ্টা করছি।
নির্বাচনটা এ বছরের মধ্যেই হচ্ছে কি না-এ প্রশ্নে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমরাতো সেটা ঘোষণা করে দিয়েছি। আবার নতুন করে বলারতো কিছু নাই।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ প্রশ্নে ড. ইউনূস বলেন, আমি অত ডিটেইলসে যাচ্ছি না। আমার বরাবরই পজিশন হলো যে আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক। আমাদের এই দেশের ওপরে সমান অধিকার। আমরা সব ভাই ভাই। আমাদের এই দেশেই বাঁচতে হবে। এ দেশকেই বড় করতে হবে। কাজেই যে মত-দল করবে, তার মতো করে, সবকিছু করবে। এই দেশ থেকে কারও অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো উপায় নাই। কিন্তু যে অন্যায় করেছে, যার বিচার হওয়া উচিত, তার বিচার হতে হবে। এটুকুই শুধু।
এ ছাড়াও ইলন মাস্কের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটা মূলত ছিল স্টারলিংক নিয়ে। এটা ব্যবসায়িক একটা সম্পর্কের বিষয় ছিল। সেবিষয়ে আমরা আলাপ করছি যে স্টারলিংকের কানেকশনটা আমরা নিতে চাই।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে