Views Bangladesh Logo

জনশক্তি রপ্তানি ডিসেম্বরে ১৪ শতাংশ কমেছে

ত বছর ডিসেম্বরে অন্যান্য মাসের তুলনায় বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসের তুলনায় ডিসেম্বর মাসে ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির ওপর।

মালয়েশিয়া এবং ওমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে। গত বছরের কয়েক মাস ধরে এমনই দেখা গেছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বিএআইআরএ) এমনটাই জানিয়েছে।

২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে গেছেন মোট ১ লাখ ১০ হাজার ৪১৩ জন শ্রমিক। আর ডিসেম্বর মাসে গেছেন ৯৫ হাজার ১৯৭ জন শ্রমিক। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন মোট ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩ জন শ্রমিক। ২০২২ সালের তুলনায় যা প্রায় ১৫ শতাংশ কম। উপসাগরীয় দেশগুলোতে গত বছর বাংলাদেশ মোট শ্রমিক পাঠিয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৮৩ জন, এর মধ্যে ডিসেম্বর মাসে গেছেন মাত্র ১ হাজার ৯৯২ জন।

সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানির দিক দিয়ে শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। গত বছর সৌদি আরবে মোট শ্রমিক পাঠানো হয়েছে ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৪ জন (মোট বাজারের ৩৮ দশমিক ১২ ভাগ)। এর পরেই আছে মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ায় গিয়েছেন ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন শ্রমিক। (মোট বাজারের ২৬.৯৪ ভাগ)। ওমানে চাকরি নিয়েছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৮৩ জন শ্রমিক (৯.৮০ ভাগ), সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯৮ হাজার ৪২২ জন শ্রমিক (৭.৫৪ ভাগ), কাতারে ৫৬ হাজার ৪১৮ (৪.৩০), সিঙ্গাপুরে ৫৩, ২৬৫ (৪.১০), কুয়েতে ৩৬ হাজার ৫৪৮ (২.৮০%), ইতালিতে ১৬ হাজার ৮৭৯ জন শ্রমিক (১.২৯), যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার ৩৮৩ জন শ্রমিক (০.৮০%), জর্ডানে ৮ হাজার ৬২৬ জন শ্রমিক (০.৬৬%), জাপানে ৯ হাজার ৬৭ (০.০৭%)। (তথ্য: বিএমইটি)

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে নিয়েছে ২২ হাজার ২৫২জন শ্রমিক, নভেম্বর মাসে নিয়েছে ২২ হাজার ৩৮২ জন শ্রমিক, অক্টোবরে নিয়েছে মোট ২১ হাজার ৯জন শ্রমিক, সেপ্টেম্বরে নিয়েছে ২১ হাজার ৫২০ জন শ্রমিক, আগস্টে নিয়েছে ৪৬ হাজার ১০৫ জন শ্রমিক, জুলাই মাসে নিয়েছে ৪০ হাজার ৩২৯ জন শ্রমিক, জুন মাসে নিয়েছে ৪১ হাজার ৪৩৮ জন শ্রমিক, মে মাসে নিয়েছে ৩৫ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক। ২০২২ সালে মালয়েশিয়ার বাজার পুনরায় চালু হওয়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিক রপ্তানি বেড়েছিল। সৌদি আরবের পর মালয়েশিয়াতেই এক মাসে বাংলাদেশের অধিকসংখ্যক শ্রমিক গেছে।

নিয়োগকারী এজেন্সিগুলোর মতে, বেশি বেতনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য পছন্দের দেশ মালয়েশিয়া। আর এখানকার আবহাওয়াও অনেকটা বাংলাদেশের মতো। মালয়েশিয়া সরকারের নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন হবে ১ হাজার ৫০০ মালয়েশিয়ার রিংগিত (বাংলাদেশি টাকায় ৩৭ হাজার টাকার সমমান)। স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিকের বেতন সৌদি আরবে ২৫-৩০ হাজারের চেয়ে বেশি হয় না। সম্প্রতি সব ধরনের কাজেই মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিক নিচ্ছে। এর মধ্যে আছে বৃক্ষরোপণ, কৃষিকাজ, কারখানার উত্পাদন, নানারকম পরিষেবা, খনির কাজ, নির্মাণকাজ এবং গৃহস্থালি কাজ।

২০২৩ সালের শেষ কয়েক মাস থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি কমে যাচ্ছে বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. শামীম আহসান সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “না, আমি তা মনে করি না। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখের বেশি শ্রমিক নেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে শ্রমিক প্রয়োজন। ৩ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে মালয়েশিয়া পৌঁছেছে এবং কাজে যোগ দিয়েছে। মালয়েশিয়া প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করে, যা সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাঙালি শ্রমিকের কর্মস্থল।”

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বিএআইআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেছেন, নতুন বছরে বাংলাদেশ নতুন বাজার খুঁজবে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে মোট ৩ লাখ ৭ হাজার ৪৯ জন শ্রমিক পাঠিয়েছে (যা মোট রপ্তানির ২৭. ৯২ শতাংশ)।

এর মধ্যে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাঠিয়েছে জানুয়ারি মাসে ১ লাখ ৪হাজার, ফেব্রুয়ারি মাসে ১ লাখ ৯ হাজার ৫৯, মার্চ মাসে ১ লাখ ৯ হাজার ৪৩৮, এপ্রিল মাসে ৭৮ হাজার ৮৩৩, মে মাসে ১ লাখ ১ হাজার ৫৫৮, জুন মাসে ১ লাখ ১৪ হাজার ১৭৫, জুলাই মাসে ১ লাখ ২৫ হাজার ৮৫০, আগস্ট মাসে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৫, সেপ্টেম্বর মাসে ১ লাখ ৭ হাজার ৫৮৪, অক্টোবর মাসে ১ লাখ ১০ হাজার ১৫৮, নভেম্বর মাসে ১ লাখ ১০ হাজার ৪১৩ এবং ডিসেম্বর মাসে ৯৫ হাজার ১৯৭ জন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসা প্রদান স্থগিত করার সিদ্ধান্ত একটি অস্থায়ী ব্যাপার। রাজনীতির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সম্প্রতি ওমানের দূতাবাসও এমনটিই জানিয়েছে।

ওমান দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান ওমান অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে ওমানের গভীর ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক ওমান মূল্য দেয়।

ওমান দূতাবাস বলেছে, রয়াল ওমান পুলিশ (আরওপি) বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য যে ভিসা স্থগিত নীতি গ্রহণ করেছে, তা ওমানি কর্তৃপক্ষের শ্রমবাজার নীতির পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয়েছে। ওমান বিদেশি শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। নিজস্ব শ্রমবাজার স্থিতিশীল করতে চায়। এর সঙ্গে বাংলাদেশি শ্রমিক কমানোর কোনো সম্পর্ক নেই। শ্রম আইন দ্বারাই তারা শ্রমিক ও নিয়োগকারীর অধিকার নিশ্চিত করবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যথাবিহিত অবস্থা গ্রহণের জন্য যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষ তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়া পুনরায় দ্রুত চালু করার জন্য যা করা দরকার তারা করছেন। সবকিছুর পর্যালোচনা করছেন।

দূতাবাস থেকে আরও বলা হয়েছে, পর্যালোচনার প্রক্রিয়া অনেক টেকনিক্যাল ও আইন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। বিদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ যেমন দেখা হয় তেমনি স্থানীয় নিয়োগকারীদের স্বার্থও দেখা হয়। এর পাশাপাশি ওমানের বিদেশি শ্রমবাজার কীভাবে স্থিতিশীল রাখা যায়, তাও নিশ্চিত করতে হয়।

রয়াল ওমান পুলিশ সম্প্রতি কোনো কারণ উল্লেখ না করেই ভিসা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। অনেক দেশের নাগরিক ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়া গিয়ে কাজ শুরু করে, ট্যুরিস্ট ভিসাকে শ্রমিক ভিসা বানিয়ে ফেলে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি তাই সব দেশের নাগরিকদের জন্যই ট্যুরিস্ট ভিসাকে শ্রমিক ভিসায় পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে স্থগিত করেছে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ