স্মার্ট ট্যাক্সেশন পলিসি ছাড়া টেলিকমের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে: পলক
টেলিকম খাতে দেড় লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয়, ১০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আনন্দিত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তবে দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর ব্যপ্তিতে আশাবাদী হলেও সন্তুষ্ট নন তিনি।
তাঁর মতে, দেশের জিডিপি’তে অবদান রাখতে টেলিকম খাতের প্রস্তুতি হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) স্মার্ট করতে হবে। স্মার্ট করনীতি ছাড়া টেলিকম খাতের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। টেলিকম খাতকে ঢেলে সাজিয়ে স্মার্ট টেলিকম খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এজন্য ঈদের পর এনবিআর চেয়ারম্যান, বিটিআরসি চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিকম খাতে পিএসআরসহ দীর্ঘমেয়াদী যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যৌক্তিক করপোরেট কর নির্ধারণ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ আমার কাছে যৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী হলেও রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনসেন্টেটিভ নিয়ে টেলিকম খাতের পক্ষে ওকালতি করবো। ঈদের পরের সপ্তাহেই আইসিটি ও টেলিকম খাতের যৌক্তিক দাবিগুলো নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবো।”
পলক বলেন, “বঙ্গবন্ধু যেভাবে শিক্ষায় খরচ নয়, বিনিয়োগ বলেছেন; ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেলিকম খাতেও খরচ নয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করি।”
টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (টিআরএনবি) আয়োজনে রবিবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেলে ‘টেলিকম ট্যাক্সেসন ফর স্মার্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোল টেবিল আলোচনায় এমন অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশেষ আলোচক ছিলেন- বিটিআরসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির, টিআই নূরুল কবির, গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান, সিনিয়র ডিরেক্টর হোসেন সাদাত, বাংলালিংক এর ভারপ্রাপ্ত সিইও তৈমুর রহমান, রবির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার শাহেদ আলম প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি ১০০ টাকা আয়ের করার বিপরীতে মোবাইল অপারেটরদের ৯৮ টাকা ব্যয় করতে হয়। এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিভিন্ন ধরনের কর বাবদ ৩৯ টাকা দিতে হয়। এরমধ্যে সাবস্ক্রাইবার ট্যাক্স ২৫ টাকা (ভ্যাট ১৫ শতাংশ, এসডি ১৫ শতাংশ ও এসসি ১ শতাংশ), সিম ট্যাক্স, কাস্টমস ডিউটি, মিনিমাম ট্যাক্স/করপোরেট ট্যাক্স বাবদ আরও ১৪ টাকা দিতে হয়। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) ১৫ টাকা, ইকোসিস্টেমে ১৮ টাকা ও পরিচালনব্যয় বাবদ ২৬ টাকা খরচ হয়।
আরও বলা হয়, মোবাইল শিল্পের অবকাঠামোর উপর দেশের সার্বিক ডিজিটাইজেশন প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। এর মাধ্যমেই ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস, রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স, শিক্ষা, কিংবা ই-কুরিয়ারসহ সকল খাত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই খাতের সার্বিক প্রবৃদ্ধি অন্যান্য সকল খাতের সার্বিক প্রবৃদ্ধির নির্ণায়ক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই খাতের উপর প্রযুক্ত বিবিধ কর দেশের অন্যান্য খাতের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই মাত্রা যথেষ্ট বেশি।
একই ব্যর্থতার কারণে দুইবার কর আরোপ ও দ্বৈতকর এড়ানো, সকল সরকারি সংস্থাসমূহের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট করা, করপোরেট করের উচ্চহার যুক্তিযুক্তকরণ, ন্যূনতম কর সমন্বয়, সিম সরবরাহের উপর মূসক অব্যাহতি ও টেলিকম মেশিনরি, ইকুইপমেন্ট ও সফটওয়ারের জন্য পৃথক এইচএস কোড প্রবর্তণের বিষয় উঠে এসেছে আলোচনায়।
সব জায়গা থেকে কর আদায় করতে হবে এই ধারণা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে টেলিযোগাযোগ খাত বিশ্লেষক সুমন আহমেদ সাবির বলেন, “সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যখন কম্পিউটারকে করমুক্ত ঘোষণা করা হলো, তখন থেকেই খাতটি উন্নতি করেছে। তাৎক্ষণিক কর না পেলেও এরচেয়ে অনেকবেশি অর্জন হয়েছে।”
যেহেতু অতিরিক্ত করারোপ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তরায়। তাই এই করহারকে যৌক্তিক করার আহ্বান জানান তিনি।
অ্যামটবের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল টি আই এম নুরুল কবির বলেন, সিগারেট কোম্পানি ও মোবাইল অপারেটর কোম্পানি একই হারে কর দিচ্ছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। করপোরেট করহার এমনিতেই অনেকবেশি। কিন্তু ইফেকটিভ করহার গিয়ে দাঁড়ায় ৫৩ শতাংশ। এটা যৌক্তিক করার পাশাপাশি টেলিকম পলিসি আরও যুগোপযোগী করার পরামর্শ তার।
বাংলালিংকের ভারপ্রাপ্ত সিইও তৈমুর রহমান বলেন, আইসিটি ও টেলিকমে এখন কার্যত কোনো দূরত্ব নেই। তাই এক্ষেত্রে স্মার্ট ট্যাক্সেশন জরুরি। প্রতিবছর একই জায়গা থেকে বারবার ট্যাক্স নিচ্ছে, এর বদলে ট্যাক্সের পরিধি বাড়ানো উচিত।
গ্রামীণফোনের সিনিয়র ডিরেক্টর হোসেন সাদাত বলেন, “স্টেকহোল্ডারদের মত নিয়ে একটি সাপোর্টিং পলিসি গ্রহণ করতে পারলে স্মার্ট বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে। গত বছরেই আমরা সরকারকে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছি। তাই আমরা সাপোর্টিং পলিসি চাই। ট্যাক্স রেসনালাইজেশন করলে বাজারে বিদ্যমান গ্যাপ মোচন করা সম্ভব হবে।”
রবির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার শাহেদ আলম বলেন, “নন ট্যাক্স খাতে সর্বোচ্চ কর দিয়ে আমরা গৌরব করি। আমাদের কর দেয়ার সক্ষমতাও রয়েছে। জাতীয় উন্নয়নের জন্য কর দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যবহারকারী পর্যায়ে বাধা সৃষ্টির মতো কোনো কর থাকা উচিত নয়। আমাদের বিশেষ সম্মানীয় বলা হলেও বিশেষ কোনো সুবিধা দেয়া হয় না। উপরন্তু অনিষ্পত্তি বিষয়ে আমাদের দিন দিন দায় বাড়ছে।”
বৈঠকে প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “কর কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হলে এই ইকোসিস্টেমের সঙ্গে জড়িত সবাইকে নিয়ে বসতে হবে। আলোচনার সব কথা যেমন উড়িয়ে দেয়া যাবে না, তবে সব কথার সঙ্গে একমত নই। তবে রিফর্ম করতেই হবে। টেলিকম খাতের টোটাল সিস্টেম রিভিউ করে আরো সিমপ্লিফাই করতে হবে।”
ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, “দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে জিরো সাম পলিসিতে কর কাঠামো ঢেলে সাজানো উচিত। স্বচ্ছতার মাধ্যমে এনবিআর-কে টেলিকম খাতের কর কাঠামো ঠিক করা উচিত।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিআরএনটি সভাপতি রাশেদ মেহেদী। আরও উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক এস এম মাসুদুজ্জামান রবিন।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে