Views Bangladesh Logo

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত, এটাই কি শেষের শুরু?

Simon Mohsin

সাইমন মোহসিন

গাজার ওপর ইসরায়েল আবার হামলা শুরু করেছে। ইসরায়েলী প্রধানমন্ত্রী নেতানয়াহু বলেন, ‘আমরা এখন যুদ্ধে নেমেছি এবং এই যুদ্ধ আমরা জিতবো।’ গত বেশ কয়েক সপ্তাহব্যাপীই ইসরায়েলের গাজার ওপর সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যাচ্ছিলো। ইসরায়েলী বর্ডার এজেন্টরাগত সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ নাকি গাজা থেকে রপ্তানিকৃত একটি জিন্স প্যান্টের শিপমেন্টে বিস্ফোরক পায়। তারপর থেকেই গাজার সব রফতানি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল।

এরই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও যথেষ্ট পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছিলো। চীন, ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার পথে কার্যকরিভাবে এগিয়ে যাওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের টনক নড়ে। সৌদি আরবকে ইরান এবং চীন থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে ওয়াশিংটনের জোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সালিভান দুইবার বিন সালমানের সঙ্গে সৌদিতে সাক্ষাৎ করেন। ব্লিংকেনও একই লক্ষ্যে সৌদি সফর করেন। এসবই গত কয়েক মাসের ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্র তার কূটনীতিতে অনেকটা সফলতাও পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ইরানের বাড়ন্ত মিসাইল সক্ষমতায় সৌদি আরবের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সৌদি এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ন্যাটোর মতো সামরিক চুক্তির দাবি করছে। একইসঙ্গে সৌদিবাসীদের জন্য বিন সালমানের উন্নয়নমূলক অঙ্গীকারগুলোর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও সমর্থনে একটি পারমাণবিক শক্তি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ওয়াশিংটনের অঙ্গিকার চায় রিয়াদ। নিরাপত্তা শক্তি বর্ধনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের সুবিধাও চেয়েছে রিয়াদ।  

গুলোর মধ্যে ন্যাটোর মতো সামরিক চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের। এ বিষয়ই কাজে লাগিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় অনেকটাই এগিয়ে চলেছে ওয়াশিংটন।

ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদির সম্পর্ক স্বাভাবিকিকরণে ফিলিস্তিনিদের কোনো অংশগ্রহণ যে নেই সেটা পরিষ্কার। বাইডেন প্রশাসন আরব- ইসরায়েল দ্বন্দ্বে ফিলিস্তিনিদের গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে না। বাইডেন নিজেই এই তত্বে বিশ্বাসকরেন।

দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনের ত্যথমতে, সৌদি- ইসরায়েল সম্পর্কের কাঠামোতে ফিলিস্তিনিদের কোনো ভূমিকাই থাকবে না বলে মনে হয়। তবে, হয়তো ইসরায়েলীদের কাছ থেকে ওয়েস্ট ব্যাংক অঞ্চল দখল না করার অঙ্গীকার নেয়া হবে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সৌদি সরকার প্যালেস্টাইন অথরিটির জন্য আর্থিক সহায়তা পুনরায় শুরু করার কথাও বলেছে,যাতে এটা প্রমাণ করতে পারে যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলেও ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্রের স্বপ্নে কোনো আঁচ আসবে না সৌদি আরবের পক্ষ থেকে। প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল সরকার কি এ অঙ্গীকার করবে কিংবা করলেও সে অনুযায়ী কাজ করবে? ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল তার উল্টোটাই করে এসেছে। আন্তর্জাতিক আইন, মানবিকতা, সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরায়েলগাজাকে বিশ্বের বৃহত্তম কারাবাস ও ওয়েস্ট ব্যাংকে তার দখল কার্যক্রম চলমান রেখেছে। ট্রাম্পের সেই তথাকথিত শতাব্দীর সেরা চুক্তির পর থেকে নেতানয়াহু বরাবরই বলে আসছেন, ‘ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলের দখল কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিক্রমেই হচ্ছে।’ইসরায়েলের সরকার দলীয় চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো তো আরো সম্পূর্ণ ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলী সার্বভৌমত্ব বিস্তারে একনিষ্ঠ। এখন তো সেই অপচেষ্টা এখন আরো জোরদার ও ত্বরান্বিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বার্তা অনুযায়ী, হামাস গাজা থেকে ইসরায়েলের ওপর স্থল, জল ও আকাশ পথে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এর পর পরই ইসরায়েল রীতিমতো গাজার ওপর যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

বাইডেনের ঘনিষ্ঠ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ফ্রিডম্যান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সৌদি- ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকিকরণ প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব কার্যক্রম বন্ধের কথা অবশ্যই থাকবে। যেমনটা ছিলো ২০২০ সালে আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ প্রক্রিয়ায়। এই বিষয়টা যে ইসরায়েলের বর্তমান চরম ও ডানপন্থী সরকারদলীয়দের মনপুত নয়, সেটা তো পরিষ্কার। তাদের ওয়েস্ট ব্যাংক দখল করার প্রচেষ্টা যে ইসরায়েলের যে কোনোভাবেই বন্ধ করবে না সেটাও পরিষ্কার।

সৌদি রাজপরিবারও কি ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ নিয়ে একনিষ্ঠ কি না সেটা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে! সৌদি- ইসরায়েলেরসম্পর্ক স্বাভাবিক হলে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনিদের আশ্বাসনিশেষের পথ সুগম হবে। বিষয়টা হয়তো হামাসও টের পেয়েছে। এজন্যই হয়তো তারা ইসরায়েলের ওপর এই তথাকথিক আক্রমণ চালিয়েছে। কারণ ওয়েস্ট ব্যাংকের আগে গাজার অস্তিত্ব সংকট দেখা দিবে। আর সেটা হতে দেয়ার আগে হামাস হয়তো শেষবারের মতো একটি লড়াই করতে চায়। কিংবা কোনো এক ছুতোয় ইসরায়েল গাজাকে নিশেষ করতে পারে সে সুযোগ তৈরি করতে চেয়েছে ইসরায়েলের মোসাদ। আসল ঘটনা হয়তো আমরা কোনোদিনও জানবো না।

গত শনিবার দিনটি ছিল ইহুদিদের পবিত্র উৎসবের দিন। এইদিনে ইসরায়েলিরা পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গেএক সাথে সময় কাটান। কেউ কেউ সিনাগগ কিংবাবন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেও আড্ডাও দিয়ে থাকেন। কিন্তু ভোরের নরম আলো ফোটার সাথে সাথে এক ঝাঁক নজিরবিহীন রকেটের হামলার মুখোমুখি হয় ইসরায়েলবাসী।

কয়েক বছরধরে ফিলিস্তিনের শহর গাজা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিল ইসরায়েল। কিন্তু গত শনিবারে ঝাঁকে ঝাঁকে রকেটের হামলায় তাদের সেই সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ইতোমধ্যে ৩ দিনের এ যুদ্ধে দুই পক্ষের ১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে ও গাজার ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৮ জন মানুষ অভ্যন্তরীন ভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই ভয়, নিরাপত্তার আশঙ্কা এবং তাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যাওয়ারকারণে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষদের মধ্যে ৭৩হাজার মানুষকে আশেপাশে স্কুলে আশ্রয় দেয়া হয়েছে।

তাহলে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের শেষ কোথায়? মোদ্দা কথা হচ্ছে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘ মেয়াদীকোনো রাজনৈতিক সমাধান বের না করা গেলে ভবিষ্যতেআরো কয়েক প্রজন্ম হয়তো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর সহিংসতারমধ্যে দিয়েই জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে। তবে, গাজার ওপর ইসরাঈলের এবারের হামলা যে এক বিশাল আঘাত হানবে, যেটা থেকে গাজা হয়তো আর কোনোভাবেই সামলে উঠতে পারবে না। এই আক্রমণই কি তাহলে ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নের ইতি টানবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তো সর্বদাই ইসরায়েল পন্থী এবং এবারও যে তারা ইসরায়েলকে তেমন কিছু করবে না,সেটা তো পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর পর্যালোচনাতেই বোঝা যায়।

লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক


মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ