বিদেশগামী তরুণদের দেশে থাকতে উৎসাহিত করুন
প্রতি বছর যত মানুষ শ্রমবাজারে যোগ দিচ্ছেন, তাদের অনেকেই দেশে পছন্দমতো কাজ পাচ্ছেন না, ফলে বাধ্য হয়ে তারা বিদেশগামী হচ্ছেন, তাদের সংখ্যাটা বছরে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ- সাম্প্রতিক সময়ে এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই তথ্য। সংখ্যাটা আতঙ্কজনক এই অর্থে যে, এতে করে দেশ মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে। দেশের শ্রমবাজারে তরুণের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
এ কথা সত্য যে, জনশক্তি রপ্তানির ফলে দেশে প্রচুর পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে; কিন্তু এমন বিপুল হারে তরুণরা দেশের বাইরে চলে গেলে তা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি। আর এসব তরুণ সবাই যে বৈধপথে বিদেশে পাড়ি জমান তাও নয়। অনেক সময় জীবনবাজি রেখে তাদের নানা অবৈধ উপায়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখতে হয়। বিদেশে গিয়েও তারা আশানুরূপ কোনো কাজ পান না। এক প্রকার মানবেতর জীবন কাটান।
গত সোমবার (১৯ আগস্ট) পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে পছন্দমতো কাজ না পাওয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তারা কাজের সন্ধানে কিংবা উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। জনশক্তি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৩ সালে কাজের প্রত্যাশায় গড়ে প্রতি ঘণ্টায় দেড়শ বাংলাদেশি দেশ ছাড়ছেন। ২০২৩ সালে বিদেশে গেছেন ১৩ লাখ কর্মী। তাদের অধিকাংশের গন্তব্যই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর শ্রমবাজারে ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ-তরুণী নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন। দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান হয় ১২ থেকে ১৩ লাখের। তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয় মজুরিভিত্তিক অনানুষ্ঠানিক খাতে, বাকিরা শোভন চাকরিতে যান। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমকে।
বিদেশগামী তরুণদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারে সন্তান। ফলে বিদেশ যেতে হলে তাদের জায়গা-জমি বিক্রি করে বা ধারদেনা করে যেতে হয়। অনেক সময় বিদেশে গিয়েও তারা অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে পারেন না। ফলে বছরের পর বছর ধরে ধারদেনা শোধ করতে হয়।
রেমিট্যান্স আসাতে আমরা খুশি হই, দেশের অর্থনীতিতে তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু কত তরুণের ঘামের বিনিময়ে এসব রেমিট্যান্স আসে আমরা জানি না। বছরের পর বছর এসব তরুণকে থাকতে হয় পরিবার-পরিজন ছেড়ে। অনেকের জন্য এ এক মানবেতন জীবন।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ দেশে শ্রমবাজার বাড়ানো। বেকারত্ব রোধ করা। কিন্তু আমাদের ছোট দেশে অনেক মানুষ এটাও একটা বাস্তবতা। তা ছাড়া সরকারের নীতিনির্ধারকরা বেকারত্ব ঘুচানোর জন্যও তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেননি। দেশে সম্প্রতি সরকার পরিবর্তন হয়েছে। আমরা চাই দেশের শ্রমবাজার পরিবর্তনেও বর্তমান সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তরুণদের শ্রমনির্ভর শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত করবে। কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা ছাড়া এ থেকে উত্তরণের পথ নেই। একটি দেশের এমন বিপুল তরুণগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে দেশের বাইরে চলে যাওয়া কোনো দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। দেশে থেকেই তারা কীভাবে দেশগঠনে ভূমিকা রাখতে পারে, সে ব্যাপার সরকারের ভাবা উচিত।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে