Views Bangladesh Logo

ডোনাল্ড লু’র চিঠি রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে

Probhash  Amin

প্রভাষ আমিন

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দৃশ্যত পয়েন্ট অব নো রিটার্নে। বিরোধী দল সরকারের পতনের একদফা দাবিতে টানা আন্দোলন করে যাচ্ছে। আর সে আন্দোলনকে পাত্তা না দিয়ে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর সরকারি দল। সংলাপ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও তা আটকে আছে শর্তের বেড়াজালে। সংলাপের ব্যাপারে সরকারি দলের আগ্রহ নেই বললেই চলে। তারা বিভিন্ন সময়ে বলে দিয়েছে, সংবিধানের অধীনে নির্বাচনের শর্ত মানলেই সংলাপ হতে পারে। আর বিএনপি বলে দিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানলেই কেবল আলোচনা হতে পারে। দুই দলের এই অনড় অবস্থানে সংলাপ কার্যত অর্থহীন বা অসম্ভব মনে হতে পারে। তবে এর মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি চিঠি রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বাংলাদেশের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির কাছে চিঠি লিখেছে, যাতে শর্তহীন সংলাপে বসার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে তারা এরইমধ্যে বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে। ইতোমধ্যে এই নীতির প্রয়োগ শুরুও হয়েছে। যারাই অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে বাধা সৃষ্টি করবে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাবেন না। এই নীতি সরকারি দল ও বিরোধী দল সবার জন্যই প্রযোজ্য। ভিসা নীতি ঘোষণার পর বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির চালচিত্র। দুই পক্ষই যথেষ্ট সংযত আচরণ করছিলেন। কিন্তু গত ২৮ অক্টোবর দুই দলের মহাসমাবেশের দিনে রাজধানীতে ব্যাপক সহিংসতায় পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। বিএনপির অধিকাংশ শীর্ষ নেতাই সহিংসতার মামলায় হয় কারাগারে, নয় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই অবস্থায় ডোনাল্ড লু’র চিঠি রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

রাজনীতিতে বাইরের শক্তির, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আমরা যতই অপছন্দ করি, মুখে যতই গালমন্দ করি বাস্তবে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অতীতেও আমরা দেখেছি যে, শেষ পর্যন্ত মার্কিন অবস্থান আমাদের মেনে নিতে হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়ার কোনো অমিল নেই। সাধারণ মানুষও একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাগিদে যদি সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসন হয়, তা মন্দ নয়।

ডোনাল্ড লু’র চিঠিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন দেখতে চায়। এজন্য শর্তহীন সংলাপের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে ভিসা নীতির কথাও। তার মানে পরিষ্কার সংলাপের মাধ্যমে সঙ্কটের সমাধান না করলে ভিসা নীতির খড়গে পড়তে হবে সবাইকে। ডোনাল্ড লু’র চিঠির ব্যাপারে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র স্টিফেন ইবেলি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ উপায়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। যুক্তরাষ্ট্র সব পক্ষকে সহিংসতা পরিহার এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে।’ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র বিবৃতিতে আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত করে না।’

রাজনীতিতে যতই উত্তেজনা থাকুক, ধরে নেওয়া যাক, ডোনাল্ড লু’র চিঠির পর রাজনীতিতে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। ডোনাল্ড লু’র চিঠির মূল বক্তব্য হলো, শর্তহীন সংলাপ। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে, সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে তাহলে সে সংলাপে বিএনপির অংশ নেওয়া অর্থহীন। আবার বিএনপি যদি মনে করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানলেই সংলাপ হবে তাহলে সে সংলাপে আওয়ামী লীগ আসবে কেন। দুই পক্ষকেই শর্তহীনভাবে খোলা মন নিয়ে সংলাপে বসতে হবে। সংলাপ থেকেই বেরিয়ে আসে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ফর্মুলা। রাজনৈতিক দলগুলো আন্তরিক হলে এমনকি সংবিধানের অধীনেও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপায় বের হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এত দিন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কথা বললেও ডোনাল্ড লু’র চিঠিতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথাও বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি বিদ্যমান কাঠামোতেই অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের গ্যারান্টি দেয় তাহলে বিএনপির নির্বাচনে না যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তারা বাংলাদেশের কোনো দলের পক্ষে নয়। তবু যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সব উদ্যোগই বিএনপিকে সুবিধা দিয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সহানুভূতি পেতে হলে বিএনপির তাদের শর্ত মানতে হবে। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে তাতে অংশ নিতে হবে।

বিএনপির অনেকে বলেন, ২০১৮ সালে তারা সরকারকে বিশ্বাস করে নির্বাচনে গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। এবার সেই ভুল করতে চান না। কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার যতটা নিবিড়ভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে, ২০১৮ সালে তা করেনি। তাই ২০১৮ সালের মতো আরেকটি নির্বাচন করে ফেলার মতো পরিবেশ এখন আর নেই। তার চেয়ে বড় কথা হলো, বিএনপির ভেতর থেকেও আন্তর্জাতিক মধ্যস্ততায় সংলাপ বা নির্বাচনে যাওয়ার তাগিদ আছে।

তবে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এই মুহূর্তে বিএনপি শর্তহীন সংলাপে রাজি হলেও টেবিলে বসার অবস্থায় নেই তারা। সংলাপে বসার জন্য হলেও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মুক্তি দিতে হবে। পালিয়ে বেড়ানো নেতাদের আশ্বস্ত করতে হবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী আমি। কিন্তু যত বিরোধিতাই করি, এখন মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্ততায় বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে ছেয়ে যাওয়া শঙ্কার কালো মেঘ সরে গিয়ে যদি আলো আসে আমার আপত্তি নেই। দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয় তাহলে তো দাগই ভালো।

লেখক: কালামিস্ট ও হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ