মানুষে মানুষে যোগাযোগ মডেলে কাজ করছে ভারত ও বাংলাদেশ
ভারত ও বাংলাদেশ পারস্পরিক সুসম্পর্কে আবদ্ধ থাকতে নানা কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছে। ধারাবাহিকভাবে কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন হচ্ছে। এরই মধ্যে দুদেশের মধ্যে সীমান্ত হাট স্থাপন, পরিবহন সংযোগের উন্নতি, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা বিনিময়ের আয়োজন, যৌথ ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনাসহ নানা বিষয়ে মতবিনিময় হচ্ছে।
ধারাবাহিক প্রকল্প গ্রহণ এবং পর্যটনের ওপর ভর করে মানুষে মানুষে যোগাযোগ স্থাপন হয়, এমন মডেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশ একত্রে কাজ করছে। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমটির প্রতিবেদকের সঙ্গে তিলোত্তমা ফাউন্ডেশনের চিফ অপারেটিং অফিসার ও একাডেমিক প্রোগ্রামের পরিচালক এবং গ্লোবাল থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কামাক্ষী ওয়াসন এসব কথা বলেন।
ভিউজ বাংলাদেশ: বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি করে ভারত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারত খুব কম পণ্য আমদানি করছে। বাংলাদেশ এই বাণিজ্য ব্যবধান কীভাবে কমাতে পারে।
কামাক্ষী ওয়াসন: ২০২৩ সাল নাগাদ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে, যা দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরে, ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, যেখানে প্রতিবেশী দেশে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার। এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয়, বাণিজ্য ব্যবধান ২০১৫-১৬ সাল অপেক্ষা তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। ৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাণিজ্যের এ ব্যবধান ১৪ বিলিয়ন ডলারের উদ্বেগজনক অঙ্কে পৌঁছেছে।
আমি মনে করি, বাণিজ্যের এই অসমতা সংশোধন এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে, বাংলাদেশকে অবশ্যই কৌশলগত বিকল্পগুলো বাস্তবায়নের কথা বিবেচনা করতে হবে, যা এই সমস্যার মূল কারণগুলোকে মোকাবিলা করতে পারে। ভারতের বৃহত্তর ভোক্তাদের আকৃষ্ট করে এমন চাহিদাসম্পন্ন পণ্য নিয়ে কাজ করা সম্ভাব্য একটি উপায়। বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা করতে হবে। স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের গুণগত ও শৈল্পিক মান উন্নত করে বাংলাদেশ সুবিধা অনুযায়ী ভারতের বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে টার্গেট করতে পারে।
পাশাপাশি, পণ্যের সঙ্গে কিছু উপহার হিসেবে রেখে ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনুন। ভৌগোলিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান থেকে সুবিধাজনক নতুন বাজার চিহ্নিত করে রপ্তানি দিগন্ত সম্প্রসারণ করতে পারে। ভারতের সীমানার বাইরে বাণিজ্য সম্ভাবনা অন্বেষণ ও সুযোগ খোঁজার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি একক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। দেশটি তার সামগ্রিক রপ্তানি কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে।
একই সঙ্গে, ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা ও উন্নত করা বাংলাদেশের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ন্যায্য শর্তে আলোচনা করা, যা পারস্পরিক সুবিধা প্রদান করে। এর মাধ্যমে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সঠিক মীমাংসার মাধ্যমে যে কোনো ভারসাম্যহীনতার অবসান ঘটবে, যা উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়াবে। একই সঙ্গে ফলপ্রসূ সহযোগিতার পথ আরও প্রশস্ত হবে। বিদেশি বিনিয়োগের খোঁজ করাও আরেকটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। দেশটি অর্থনীতির মূল খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে পারে। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগাতে উদ্দীপিত করতে পারে।
গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ (আরঅ্যান্ডডি) হলো আরেকটি উপায়, যার মাধ্যমে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। দেশি শিল্পের মধ্যে উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশি একটি প্রতিযোগিতামূলক অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। উচ্চতর মূল্য সংযোজন পণ্য উৎপাদন করে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। উদীয়মান প্রবণতা ও ভোক্তাদের পছন্দ শনাক্ত করার জন্য ‘বাজার গবেষণা’ বাংলাদেশকে আরও লক্ষ্যযুক্ত রপ্তানি কৌশলের দিকে পরিচালিত করতে পারে। চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে পর্যাপ্ত পণ্য উৎপাদন করে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা ভারতীয় বাজারের দখল নিয়ে ভালোভাবে অবস্থান করতে পারে।
রাজস্বের বিকল্প উৎস হিসেবে পর্যটন ও সেবার প্রচার বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কার্যকর বিকল্প। দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বিস্ময় ও অনন্য অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নতুন গন্তব্যের সন্ধান হিসেবে ভারতীয় পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে বাংলাদেশ, যার ফলে আতিথেয়তা, ট্রাভেল এজেন্সি এবং স্থানীয় শিল্প ও কারুশিল্পের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে উদ্দীপনা দিতে পারে। সব শেষে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্যক্তিদের অর্থনীতিতে কার্যকরভাবে অবদান রাখতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞানের অধিকারী করবে। শিল্পের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ উদ্যোগগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে পারে, যারা দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা সংশোধনের লক্ষ্যে বহুমুখী পন্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিকভাবে উপকারী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে প্রস্তুত। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। পণ্যের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, রপ্তানি দিগন্ত সম্প্রসারণ, বাণিজ্য চুক্তির উন্নতি, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে বিনিয়োগ, বাজারের বুদ্ধিমত্তাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার, পর্যটন ও সেবার প্রচারের পাশাপাশি শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেয়ার মাধ্যমে সমন্বিত প্রচেষ্টায় এমন অবস্থান তৈরি সম্ভব।
ভিউজ বাংলাদেশ: প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ভারত কীভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে?
কামাক্ষী ওয়াসন: আমি বিশ্বাস করি, ভারত ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশকে অটল সমর্থন দিয়েছে। ভারত দেশের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী ও প্রচার করতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ প্রতিশ্রুতি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। নির্বাচনি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার অনুমোদন, বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলা, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উৎসাহিত করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুবিধা প্রদান, একটি স্বাধীন ও নিরবচ্ছিন্ন মাধ্যম করা, শাসন ও জনসাধারণের বিষয়ে জ্ঞান আদান-প্রদান সহজতর এবং প্রশাসন ও সহযোগিতার জন্য আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টা চলমান। পাশাপাশি, আমি মনে করি, ভারতের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলোকে বাড়ানো, সুশীল সমাজ ও মিডিয়া সংস্থাগুলোকে সমর্থন, সুশাসন এবং স্বচ্ছতার পক্ষের ব্যক্তিদের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে উৎসাহ ও উন্নয়ন সহায়তা প্রদানের জন্য প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে।
ভিউজ বাংলাদেশ: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরা ভিসা ছাড়াই ওই অঞ্চলের যে কোনো জায়গায় যেতে পারে। আপনি কী মনে করেন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ভিসামুক্ত চলাচলে কাজ করা উচিত?
কামাক্ষী ওয়াসন: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ভিসামুক্ত ভ্রমণের অনুমতি দেয়ার ধারণাটি বিভিন্ন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তবে এক্ষেত্রে কিছু বাধাও রয়েছে। এ ধরনের চুক্তি আঞ্চলিক একীভূতকরণ, বাণিজ্য ও পর্যটন বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উৎসাহিত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে পারে। বিপরীত দিকে, এই চুক্তির কারণে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরূপ প্রভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ঐতিহাসিক উত্তেজনা থেকে উদ্ভূত চ্যালেজ্ঞের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
ধারাবাহিক এ একীকরণ কৌশলের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বসহ চালিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো মডেল হিসেবে ‘বিআইএমএসটিই’ কৌশল অনুসরণ করতে পারে। উপ-আঞ্চলিক এই গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত উপায়ে ভিসামুক্ত আন্দোলন অর্জনের পথ প্রশস্ত করতে পারে, কারণ আমি এটিকে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি।
ভিউজ বাংলাদেশ: বাংলাদেশ ও ভারতের উভয় নেতাই জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর জোর দেন। উভয় দেশ কীভাবে এই মডেল বাস্তবায়নে কাজ করতে পারে?
কামাক্ষী ওয়াসন: ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্ত হাট স্থাপন, পরিবহন সংযোগের উন্নতি, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা বিনিময়ের আয়োজন, যৌথ ক্রীড়া ইভেন্টের আয়োজন, অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ ক্রমাগত বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে জনগণের মধ্যে যোগাযোগের মডেল বাস্তবায়নের জন্য নির্বিঘ্নে একসঙ্গে কাজ করছে। সাহিত্য, রন্ধনপ্রণালি, টেক্সটাইল এবং ভাষার মধ্যে তাদের গভীরে মূল শেকড়ের সংযোগ তুলে ধরে। এ ছাড়াও, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সাহিত্য ও সংগীতের প্রভাব এবং সেইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাম্প্রতিক বায়োপিক নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সৃজনশীল সহযোগিতার কথা ভুলে গেলে চলবে না। ইলিশ মাছ এবং ভাতের খাবারের মতো রন্ধনসম্পর্কীয় আনন্দ উদযাপনের মধ্য দিয়েই একের প্রতি অপরের ভালোবাসা ভাগাভাগি হয়। ভাষাগত অভিন্নতাও সাংস্কৃতিক বন্ধনে অবদান রাখে। পূর্ব ভারতে কথ্যভাষা বাংলা। সূক্ষ্ম শাড়ি এবং পরিধানের সংস্কৃতির নান্দনিকতাও একইরকম। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই গভীর মূল সংযোগের মধ্যে খোঁজ করার মতো কিছু বিষয়াদি আছে।
ভিউজ বাংলাদেশ: ভারতের কিছু ভোগ্যপণ্যের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। ভারত মাঝে মাঝে কিছু ভোগ্যপণ্য যেমন চাল, গম, পেঁয়াজ, চিনি, রসুন ইত্যাদির রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশ কীভাবে ভোগ্যপণ্যের স্বার্থ রক্ষায় ভারতের সঙ্গে কাজ করতে পারে?
কামাক্ষী ওয়াসন: প্রথমত, আমি মনে করি আপনি আশ্বস্ত হতে পারেন যে ভারত বাংলাদেশকে খাদ্য সরবরাহে সহায়তা অব্যাহত রাখবে, যেমনটি সবসময় তার প্রতিবেশীদের কমবেশি সহায়তা করে আসছে। ভারতের ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতি বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অগ্রাধিকার ও চাহিদাসম্পন্ন সম্পৃক্ততার ওপর জোর দেয়। এই নীতির আওতায় বর্ধিত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, উন্নত সংযোগ এবং অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, সাংস্কৃতিক এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তায় সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক ফোরামে সমর্থন, মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা এবং যে কোনো সংকট মোকাবিলায় সংহতির প্রকাশ পায়।
আপনি যেমন বলেছেন, ভারত কখনো কখনো কিছু ভোগ্যপণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই এমনটি হয়ে থাকে। যাই হোক, ভারতের নীতিনির্ধারকরা এই পরিস্থিতিগুলোতে বাংলাদেশের জন্য সংলাপ, কূটনীতি, নীতিগুলোর পুনর্মূল্যায়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য সমন্বয় সহায়তার মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ চাল, গম, পেঁয়াজ, চিনি এবং রসুনের মতো অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করতে পারে। ভারতের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট চুক্তির আলোচনা, আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ, কৃষি উদ্যোগে সহযোগিতা, বাফার স্থাপনসহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। স্টক চুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তিতে প্রবেশ, অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতায় জড়িত, প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক কূটনীতির সুবিধা এবং বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। আমি মনে করি, এই সামগ্রিক কৌশলগুলো বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উচ্চতর স্তরের স্থিতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতার গ্যারান্টি দেবে। ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সহায়ক হবে।
ভিউজ বাংলাদেশ: দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের একটি কৌশলগত অবস্থান রয়েছে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থানকে ভারত কীভাবে দেখছে?
কামাক্ষী ওয়াসন: ভারতের লক্ষ্য বাংলাদেশের অগ্রগতি, সম্প্রসারণ এবং উন্নতিকে সমর্থন করা। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, নিরাপত্তা জোট, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন, আঞ্চলিক সংযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা (বিআইএমএসটিইসি), পরিবেশ ও জলবায়ু-সংক্রান্ত সহযোগিতার ক্ষেত্রে বহুক্ষেত্রগত প্রযুক্তির জন্য বঙ্গোপসাগরের উদ্যোগের ফলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ভূমিকাকে স্বীকার করে ভারত। উদ্বেগের বিষয়ে সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা, সেইসঙ্গে আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বজায় রাখার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এই সম্পর্ক একটি আঞ্চলিক স্কেলে বৃহত্তর সহযোগিতা ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করার জন্য ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারত ধারাবাহিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। প্রাথমিকভাবে, লাখ লাখ বাংলাদেশি শরণার্থীকে অভয়ারণ্য প্রদান, সামরিক সহায়তা প্রদান ও কূটনৈতিকভাবে সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে ‘ভারত’ মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাছাড়া, ভারত কূটনৈতিক অনুমোদন, সহযোগিতামূলক স্বাস্থ্য উদ্যোগ, জ্ঞান ও সম্পদ ভাগাভাগি, বিশ্ব স্বাস্থ্য ফোরামে সমর্থন, স্বাস্থ্যসেবা সহযোগিতার বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মাণদণ্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জনে বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছে। পাশাপাশি ভারত কভিড-১৯ মহামারি চলাকাকলে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও দক্ষতা সরবরাহের মাধ্যমে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাছাড়া যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট ডোমেনে এই দ্বিপক্ষীয় সমর্থনের পাশাপাশি, ভারত জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও ‘বাংলাদেশ’ ভারতের আমন্ত্রণে ওই সম্মলনে যোগ দেয়। এর মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ পাদদেশ এর তাৎপর্য তুলে ধরে ভারত একটি অনুকরণীয় পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করেছে।
এ প্রচেষ্টাগুলো ভারতের ‘প্রতিবেশী ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। এ পদক্ষেপ গতিশীল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের প্রাসঙ্গিকতা এবং সুবিধাগুলোর সমন্বিত ক্ষমতার বলয়ে প্রত্যয়ী মেজাজে বাংলাদেশ এ অঞ্চলে বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত হতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হবে। ‘যার ফলে একটি গতিশীল, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদানে কাজে আসবে।’ পরিবর্তে এ বাক্য ‘এই পদক্ষেপ গতিশীল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’
ইংরেজি থেকে বাংলা করেছেন: আবু সালেহ ইউসুফ

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে