রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির একযুগ, আক্ষেপ আর ক্ষোভ নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শ্রমিকদের
সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির একযুগ পূর্তির দিনে নিহত পোশাক শ্রমিকদের স্মরণ করছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মী, পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) সকালে রানা প্লাজার সামনে নির্মিত অস্থায়ী শহীদবেদিতে রাষ্ট্র সংস্কার শ্রমিক আন্দোলন, গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের পাশাপাশি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নানা শ্রেণি-পেশার মানুষও। ছুটে আসেন নিহতদের স্বজন ও আহতরাও।
১২ বছর আগে ২০১৩ সালের এই দিনে নয়তলা ভবনের রানা প্লাজা ধসে পাঁচটি পোশাক কারখানার এক হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক নিহত ও অন্তত এক হাজার ৭৬৯ জন আহত হন, এখনো নিখোঁজ ১৮২ জন।
ভয়াবহ সেই ঘটনায় দিনটি ঘিরে দিনভর নানা কর্মসূচি পালন করছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।
সমবেত আহত শ্রমিকদের দাবি, ১২ বছরেও কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি সরকার। সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। আহতদের কেউ কোনো কাজ করতে পারেন না। তাদেরকে পুনর্বাসনেরও উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্পশ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজনের দাবি, ক্ষতিপূরণের আইন সংশোধন করে রানা প্লাজা, তাজরীনসহ সব আহত ও নিহত শ্রমিকদের একজীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। শ্রমিক হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
১৭ বছরের বিজয় হোসেন ফুল দিয়ে স্মরণ করেন রানা প্লাজা ধসে নিহত মা শিলিনা বেগম ও বাবা শাহাদাত হোসেন শামীমকে। তিনি নিজেই এখন পোশাক কারখানার হেলপার।
বিজয় জানান, তার মাকে তিনদিন পর উদ্ধার করা হয়। কিন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। কিন্ত বাবার মরদেহ ঘটনাস্থলে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার দাদীর সাথে ডিএনএ শনাক্ত করে অনেক পরে মরদেহের সন্ধান মেলে জুরাইন কবরস্থানে।
তার অভিযোগ, ‘আমাদের দেয়া ক্ষতিপূরণ খুবই সামান্য। পড়ালেখা বাদ দিয়ে তিনমাস আগে কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছি। আমাদের তো সঠিকভাবে কেউ চেনেও না’।
আহত আফরোজা বেগম আসেন মেয়ের সাহায্য নিয়ে।, তিনি বলেন, ‘সকালে জোর করে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। সেদিন থেকেই আমি অসুস্থ। পরে আরও বড় বড় রোগ ধরা পরেছে। দায়ীদের বিচার হয়নি, আমরাও কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। সামান্য যেটুকু অনুদান পেয়েছি, সব চিকিৎসা আর ওষুধ কিনতে চলে গেছে। আমাদের কাছে আর কোনো টাকা-পয়সা নেই। ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসা করাবো কিভাবে?’।
তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষ, বড়লোক হলে তো আর কাজ করতে আসতাম না। রানা প্লাজা আমাদের একদম পথে বসিয়ে দিয়েছে। তার ওপরে ১২ বছর ধরে ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েও ঘোরাচ্ছে’।
‘আমাদের দাবি, আমাদের পুনর্বাসন করতে হবে। ন্যায্য পাওনা আর যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে’- বলেন আফরোজা।
স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, ‘রানা প্লাজা ধস কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু এক যুগেও নির্মম ঘটনাটির মামলাগুলোর বিচার শেষ হয়নি, যা খুবই দুঃখজনক’।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ফান্ডে প্রচুর অর্থ দেন। অথচ নিহত শ্রমিকদের পরিবারসহ আহত শ্রমিকেরা গত একযুগেও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি’।
খায়রুল মামুন মিন্টু আরও বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ভবনমালিক এক যুগ ধরে কারাগারে আছেন, বিচারকাজ শেষ হয়নি। কিন্তু কারখানার মালিকেরা দিব্যি বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন’।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে